নবজীবন
জয়ন্ত দত্ত
টাকাটা পেলেই সাবিত্রী উতরে যেত। ঘরের লোকটা চোলাই খেয়ে দাপরে মরেছে। কিচ্ছু করতে পারেনি সাবিত্রী। এক দু হাজার টাকা থাকলে অন্তত ছেরাদ্দটা ভালো করে করতে পারত সাবিত্রী। কিন্তু গনার বাপের কপালে সেটুকও জোটেনি! শ্যামলী,করুণা,পার্বতী আর সকল বস্তি মেয়েদের এখনো গতর আছে! এখনো দশ বাড়ি খেটে খায়। শেষ বাড়ি বাসন মেজে ফেরার পথে কারসেডের ধারে দাঁড়ালেই দু তিনশ টাকা এমনিই আসে। সাবিত্রীর কি আর সে গতর এখনো আছে! ছাগল চড়াতে গিয়ে খোঁটা আটকে আছড়ে পড়ে ঠ্যাং টাও তো ভেঙেছে সে কোন কালে। তখন গনার বাপ বেঁচে। কোথা থেকে যেন তেউড়ি গাছের ডাল এনে একমাস ধরে ভাঙা হাড়টার ওপর বেঁধে রেখেছিল। হাড়টা জুড়েছিল নাকি ভাঙাই আছে সে কথা হাড়টাই ভালো বলতে পারবে! সাবিত্রীর আর কি! ল্যাংড়ে ল্যাংড়ে বাপমরা ছেলেটার জন্য দু বেলা দু মুঠো ফুটিয়ে তো দিতে পারে!
সেই তেরো বছর বয়সে এই বস্তিতে গনার বাপের হাত ধরে এসে উঠেছিল সে। বাসন্তীর মা দূর্বা ঘাস ছিঁড়ে এনে মাথায় মধ্যে গুঁজে দিয়ে বলেছিল,
-“তোর হাড়ি ভরা ভাত হোক, কপাল জোড়া স্বামী হোক, কোল ভরা ছেলে হোক।”
একটা টিনের ছাউনি আর ছিটেবেড়ার একচালা ঘর। ট্রেনের হাওয়া দিলে মাঝরাতে দারজা খুলে তেলচিটে পর্দাটা ফতফত করে উড়ত। সাবিত্রী আসার পর এই ঘরে চাঁদের আলো পড়েছিল। সে ছিল একটা সময়। গতর ছিল, রুপ ছিল, যৌবন ছিল। দুহাতে কামিয়ে সংসার চালিয়েছে, স্বামীকে মদ খাইয়েছে। গনাকেও মানুষ করেছে। তবে মানুষের মতো মানুষ করতে পারেনি। গনাটা মোটে স্কুল যেতোনা! লোকের বাড়ি কাজ করে কি আর আর অত নজর দেওয়া যায়! ছেলেপুলে নিজের মতো খাবে দাবে ইস্কুল যাবে তা নয়! বাবুদের বাড়ির ছেলে গুলোকে দেখো- কেমন সুন্দর করে মানুষ হয়। তা অবশ্যি ওদের কে ওদের মায়েরা রাতের বেলায় পড়তে বসায়। কিন্তু যাদের বাপ মা পড়তে জানেনা তারা কি নিজের চেষ্টায় মানুষ হবেনা!
আরে ধুর ধুর ধুর! সেসব এখন অতীত! সাবিত্রীর আর ভাবতে ভালো লাগেনা!
গনাটা গতকাল রাত থেকে থানায় পড়ে আছে। ঝুপড়ি পট্টিতে হিরোইন খেতে গিয়ে ধরা পড়েছে। এই নিয়ে তেরো বার ধরা পড়ল। যে কদিন থানায় থাকে সাবিত্রীর একটু হাড় জুড়োয়। তারপর হিরোইনের নেশায় যেই দুদিন বাদে খিঁচুনি ওঠে, কোর্টে চালান করার আগেই থানার মেজো বাবু পেছনে লাথি মেরে গনাকে বিদেয় করে। কিন্তু এবার টা সাবিত্রী মনে প্রাণে চায় গনা যেন থানা থেকে কোর্টে চালান হয়। তারপর জামিনের অভাবে সরাসরি যেন তার হাজত বাস হয়।
কারন।।?? কারন সে অনেক লম্বা লিস্ট…
হিরোইনের নেশায় গতকাল রাতে গনা পাশের বস্তির এক বাচ্চার কান দিয়ে হেঁচকা মেরে কানের দুল ছিঁড়ে নিয়েছে। বস্তির লোক বেজায় চটে। কানের দুটোর বর্তমান বাজার দর দুহাজার টাকা! সাবিত্রী গনাকে কোনো দিনও ক্ষমা করতে পারবেনা! কানের নিবি নে, তাবলে ওটুক একটা বাচ্চার কান কেটে! ছি ছি ছি! তাছাড়া চুরি করতে হলে বড়বাবুদের বাড়িতে দানমার। সেখান থেকে দুহাজার টাকা খসলে তো আর গায়ে লাগেনা। ঝুটমুট গরীব ঘরে চুরি মানে তো ছুঁচো মেরে সগ্গে যাবার উপক্রম!
সকাল থেকে খান চারেক বার বস্তির ছোকরা গুলো এসে সাবিত্রীকে বলে গেছে-, ‘হয় কানের দাম আর নয়ত গনার প্রাণ, যেকোনো একটা তাদের চাই!’
সামান্য একটা কানের জন্য এত বড় লজ্জা! সাবিত্রীর চোদ্দ পুরুষের মানে লাগে! লোকের বাড়ি বাসন মেজে খেলেও এ বস্তিতে তার একটা সম্মান আছে! তার মুখ পানে চেয়েই হয়তো গনাকে এতকাল সেভাবে কেউ কিছু বলেনি! কিন্তু এবারটা আর রক্ষে নেই। নির্ঘাত গনা মরবে। আর গনার যা রেপুটেশন! তাতে পিটিয়ে মারলেও লোকে দুর থেকে দেখবে। তবু মায়ের জান! কিন্তু কিইবা করে সে! ঘরে যেখানে যতটুকু বেঁচে ছিল সবটাই তো গনা বেচে খেয়ে নিয়েছে! এখন দুহাজার টাকা কোন রকমে জোগাড় করা গেলেও কিছুটা রক্ষে! সাবিত্রীর চোখে ঘুম নেই। সারা দিন কাজে সে কি যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল! অবশেষে সন্ধ্যা বেলায় বস্তির লিডারদের হাতে পায়ে ধরে দুহাজার টাকার বিনিময়ে গনার মূল্যহীন প্রাণটা সাবিত্রী ভিক্ষে চেয়ে নিয়েছে! দাদারা কথা দিয়েছে , ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে যদি কাল বিকেল চারটের মধ্যে দুহাজার টাকা দিয়ে দেওয়া যায় তাহলে গনাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
সাবিত্রীতো বলেই খালাস! কিন্তু এখন টাকাটা আসবে কোথা থেকে?
অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে সাবিত্রী ঘরের দিকে ফিরলো।পথে দেখা হল শ্যামলীর সাথে। শ্যামলী নষ্ট মেয়েমানুষ হলেও সাবিত্রীকে বড্ড বেশী ভালোবাসে। সাবিত্রীকে অন্ধকারে দেখে শ্যামলী জিজ্ঞেস করল-
- গনা তোমাকে শান্তি দিলো গো কাকিমা!
-আর শান্তি! শান্তি আমার চিতেয় উঠে হবে রে মা! তা তুই এত রেতে কোথায় গেছিলি? - ‘আর বলোনিকো কাকিমা। এই যে গত সপ্তাহে আমার শাউড়ি মরেছে তার জন্যি এই দুহাজার টাকা সরকার দেয়েছে আজ আমারে কাউন্সিলরের বাড়ি গিয়ে আনতে হল।’
- ‘বাপরে মানষে মরলেও আজকাল সরকার টাকা দেচ্ছে?’
- ‘হ্যাঁ গো কাকিমা! এটা হল গিয়ে ‘সমব্যথী’ প্রকল্প। মানুষ মরলে সরকার মানষের বাড়ি এসেও অনেক সময় টাকা দে যায়।’
-‘দুহাজার টাকা! মনুষ মরলে! বাপরে!! হা ঈশ্বর! ওটাকা টা যদি বেঁচে থাকতে পেতাম তাহলে গনাটারে কাল বাঁচাতে পারতাম!’ - কেঁদুনি কাকিমা কেঁদুনি। চলো তোমাকে বাড়িতে দে আসি। চলো…’
আর বাড়ি! একচালা টিনের খুপড়িটা এখন বারুদের কৌটো! চোখের সামনে খালি ভাসছে কাল গনাকে কুকুরের মতো সবাই পিটিয়ে মারবে। কারো হাতে বাঁশ,কারো হাতে জুতো কারো হাতে ইঁট! গনাকে থেঁতো করে গনার গালের টাটকা রক্ত জোর করে বের করা আনা হবে। সাবিত্রীকে দুরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখতে হবে! চোরের মা হলেও বড় গলা আজ আর তার আর মানায়না! চোর ধরা পড়লে চোর ছাড়া বাকি সবাই তখন বিপ্লবী! সাবিত্রী কিভাবে সবটা দেখবে! শত হলেও সেতো মা! তার বুকের ব্যথা সে আজ অন্য কাউকে বোঝাতে পারেনা! আজ সে এত বড় পৃথিবীতে সত্যিই বড়ো একা! ভয়ঙ্কর ভাবে একা! এদিকে নেতা দাদাদের কাছে অসম্ভব কথা দিয়ে এসেছে! কাল সকালের মধ্যে দুহাজার টাকা জমা দেবে! কিভাবে দেবে? কোথা থেকে দেবে? সাবিত্রী যে সে টাকা শোধ করতে পারবেনা, সেকথা শুধু সাবিত্রী নয় এ বস্তির প্রায় সকলেই জানে!
হঠাৎ সাবিত্রীর মনে পড়ে গেল শ্যামলীর কথা। মানুষ মরলে দুহাজার টাকা!
সে বেঁচে থেকে না হোক মরে গিয়েও তো ছেলের প্রাণ বাঁচাতে পারবে!
প্রথমত সাবিত্রী মরে গিয়ে তার হাড় টুকু জুড়োবে।
দ্বিতীয়ত মা মরে গেলে ছেলেটাকে মারার মতো অতটা নিঠুর প্রাণী নিশ্চয়ই কেউ নেই!
তৃতীয়ত মরে যাওয়ার পর গনার কাছে কেউ ক্ষতিপূরণের জন্য টাকা চাওলেও দুহাজার টাকা গনার হাতে মজুত থাকবে।
এই তিনটি কারন বুকে চেপে সাবিত্রী মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হল। বুকটা চিনচিনে করে উঠল। ক্ষণিকের জন্য এতদিনের এই কুৎসিত জগতটা সাবিত্রীর চোখে অতীব সুন্দর মনে হল। কাল থেকে আর সে দেখতে পাবেনা এই জগৎ! এই ঘর,গনার মুখ,বস্তি, উনানের চুলা……!
সাবিত্রীর বুক থেকে নোনতা জল মোচড় দিয়ে বেড়িয়ে এসে চোখের কোনে জমা হল!
গনার বাপের চুন উঠে যাওয়া আবছা ফটোটা বুকে আগলে সাবিত্রী হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। নাহ্! আর দেরি করে লাভ নেই! যা করার এখুনি করতে হবে। সন্তানদের জন্য মা প্রাণ দেবে একথা বিশ্ব জগতে আর নতুন কি! সে সাধুর মা হোক আর চোরের মা! মা’তো যে মা-ই হয়…
পাশে পড়ে থাকা হাতুড়ি মার্কা ফিনাইলের শিশিটা এক নিমেষে শেষ করে দিল সাবিত্রী। তারপর থেকে মৃত্যুর প্রহর গোনা শুরু। ক্ষনিকের মধ্যে অস্থির হয়ে উঠল সাবিত্রী। এখনো সে মরছেনা কেন? কখন শুরু হবে মৃত্যুর যন্ত্রণা! এই প্রথম সে মৃত্যুর যন্ত্রণাকে কাছ থেকে অনুভব করবে! ঠাকুর কে ডাকল সাবিত্রী।
-‘হে বাবা জটেশ্বর, অল্প কষ্টদিয়ে মেরে ফেলো বাবা! ছেলের জন্যই তো মরছি! কাত হয়ে পড়েই যেন টুপ করে মরে যাই!’
ভাবনার মধ্যেই পেটের নাড়িভুঁড়ি যেন সব সেঁধিয়ে উঠল। বিকট সব ঢেঁকুর বুকের কাছে আছড়ে পড়ল!
মাথাটা ঘুরছে!
মরবে, সাবিত্রী এবার মরবে। অসহ্য পেটে যন্ত্রণা শুরু হল সাবিত্রীর।
বমি পাচ্ছে,
-না বমি করলে চলবেনা। কিন্তু সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা! অসহায় ছোটলোকের মায়ের মতো মাটিতে শুয়ে হাতপা ছুঁড়তে লাগল। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে অসহ্য গেঁজা বুদ বুদের আকারে দাঁতের ফাঁকদিয়ে সজোরে বেড়িয়ে এসে ঠোঁটের ওপর পুঞ্জীভূত হতে শুরু করল। বেশ কিছুক্ষণ দাপাদাপি করতে করতে সাবিত্রী মরল!
সাবিত্রীর আত্মাটা দেহ থেকে বেড়িয়ে এসে তখনো ছটফট করতে লাগল।মত্যুর ঘোর কাটেনি তখনো! বেশ কিছুক্ষণ পর সাবিত্রীর আত্মা স্থির হতে দেখতে পেল, তার নিজের মৃত দেহটা কুঁকড়ে একটুখানি হয়ে মাটির মধ্যে পড়ে আছে। সাবিত্রী ভাবল, ‘আরিব্বাস! মৃত্যুতো খুব সহজ! বরং প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধতো মৃত্যুর থেকেও ভয়ঙ্কর! সাবিত্রী বুঝল আসলে সে এখন শুধুই একটা আত্মা!
লোকে তাহলে ঠিকই বলে।একবার টিভির একটা সিনেমাতে সাবিত্রীও দেখেছিল, যে বডি পড়ে থাকে কিন্তু আত্মা ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। তাকে কেউ দেখতে পায়না আর সেও কাউকে ছুঁতে পারেনা! পরখ করে নেওয়ার জন্য কুঁকড়ে যাওয়া ডেডবডিটাকে সাবিত্রী সোজা করে দিতে গেল।কিন্তু হ্যাঁ, একদম হুবহু সিনেমারই মতো!
-যতবার সে সোজা করতে যায় ততবারই হাত ঢুকে যায় শরীরের ভিতর, কিন্তু কিছুতেই সে হাত লাগাতে পারছে না!
সাবিত্রী এও শুনেছে, মরে যাওয়ার পরে নাকি যমদূত নিতে আসে। দরজার দিকে তাকালো সাবিত্রী।
-“কই কেউ তো এখনো এলোনা!
ঘরে একা সাবিত্রী আর সাবিত্রীর ডেডবডি। সাবিত্রীর বুকটা তখনো হালকা ব্যথায় চিনচিন করছে। বারবার মনে হচ্ছে গনাটা এক্ষুণি এসে বলবে- ‘মা একটু ভাত দাও।’ আর সাবিত্রী কখনই তা দিতে পারবেনা! তার সব শেষ অথচ সে আছে। কি অদ্ভুত ব্যাপার তাইনা!
সাবিত্রী বডিটার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে ভালো করে চেয়ে দেখল। মুখের গেঁজাটা মুছে দিতে চাইল কিন্তু পারলনা! ভারি কষ্ট হচ্ছে তার। ‘আহারে! জীবনে বডিটা কোনো সুখ পেলনা! কি হত একটু বড়লোকের ঘরে জন্মালে! মানুষ যেমন আয়নায় নিজের অবয়ব দেখে নিজেই হাসে আবার নিজেই কাঁদে সাবিত্রীও তাই করল! হাসল তখন এটা ভেবে, যে তার আর খিদে পাবেনা! খিদে না পেলে লোকের বাড়ি আর বাসন মাজতেও হবেনা!
‘বাহ্ রে এটা তো ভারি মজার!’
ভাবতে না ভাবতেই শ্যামলী ঢুকলো ঘরে। তারপর বাকিটা ইতিহাস….
নিমেষের মধ্যে বডি শ্মশানে। চাঁদা টাদা তুলে এর মধ্যে অনেক কান্ড ঘটে গেছে! সাবিত্রীর আত্মা সাবিত্রীর বডির আশপাশ থেকে এক বিন্দুও নড়েনি! মাঝে মাঝে শুধু উঁকি মেরে দুএক বার দেখেছে, গনাটা এখনো আসেনি! বডি শ্মশানে আসার কুড়ি মিনিট পর গনা এল। কালু আর মদনা তাকে ধরে ধরে নিয়ে এসেছে! ভারী লজ্জা হল সাবিত্রীর। আজকের দিনটাও গনা চরিয়েছে!
গনা এসেই মা…. বলে দরাম করে সাবিত্রীর বুকে আছড়ে পড়ল। সাবিত্রী মরে গিয়ে যেন অসম্ভব এক মন বোঝার শক্তি পেয়েছে। সাবিত্রী পরিস্কার বুঝতে পারল গনা টোটালি ফলস কাঁদছে। বস্তির হাত দিয়ে বাঁচার জন্য এটা নিছক অভিনয়। তবু বাঁচুক ছেলেটা। এটাই তো উদ্দেশ্য ছিল সাবিত্রীর। দেখতে দেখতে সাবিত্রীর বডিটা চিতায় উঠল। সাবিত্রীর মুখে গনা গনগনে আগুন জোর করে ঠুসে দিল। তারপর দেহটা চুল্লিতে প্রবেশ করল। ভারী মায়া হল সাবিত্রীর। এই দেহটা জন্ম নিয়েছিল সেই কোন কালে! ছোট্ট থেকে এত বড় হল তারপর এক নিমেষে আগুনে ঢুকল! চোখ ছলছল করে উঠল সাবিত্রীর! বডির সাথে সেও ঢুকলো চুল্লির ভিতর। বাপরে লাল আলোয় চারিদিক অন্ধকার! কিছুই দেখা যায়না! চুল্লির ভিতরে একদম কর্নারে দুটো বুড়ো ভুত বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে! সম্ভবত একটু আগেই তারা চিতেয় উঠেছিল! সাবিত্রী আর দেখতে পারছেনা এসব! মাংস গুলো চরচর করে পুড়ে হাড্ডি-গুড্ডি সব বেরিয়ে আসছে! সাবিত্রী বেরিয়ে এল বাইরে! ততক্ষণে গনাকে সকলে ঘাটের দিকে নিয়ে গেছে। সাবিত্রী উড়ে উড়ে ঘাটের দিকে গেল।
ঘাটে তখন বেজায় গন্ডগোল!
রাজীব মানে বস্তির এক সহৃদয় ছোকরা গনাকে একেবারে চেপে ধরেছে-
-‘তোর মার পোস্টমর্টেম বাবদ পাঁচশ টাকা লেগেছে। আমি সেটা মিটিয়ে দিয়েছি। কাজ মিটলে আমাকে টাকাটা মিটিয়ে দিবি।’
বিজয় বলল-
-‘ঘাট বাবদ সাতশো টাকা আমি দিয়েছি।’
বাচ্চা মেয়েটির বাবা বলল-
-‘দু-হাজার না দিস, কানের বাবদ হাজার টাকা অন্তত আমাকে দিবি।নয়ত তোকে বস্তির ছেলেদের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবেনা!মায়ের পর তুইও চিতেয় উঠবি!’
সাবিত্রী অস্থির হয়ে উঠল! লোকে এত কথা বলছে কিন্তু সমব্যথীর দুহাজার টাকার কথা কেউ বলছেনা কেন? এদিকে চাপে পরে গনা এককোনে ধরাপড়া খটাশের মতো চেয়ে আছে! এই ফাঁকে কে যেন বলে উঠল-
-‘এই গনা? পার্টি অফিস থেকে সমব্যথীর যে দুহাজার টাকা পেয়েছিস তা দিয়ে এখন সবার ধার দেনা গুলো মিটিয়ে দে না!’
কালু ঠোঁটটা দাঁতের কাছে ঈষৎ বেঁকিয়ে নাটকীয় সুরে বলে উঠল-
‘বাওয়া!! ওটাকা ওর কাছে এখনো আছে নাকি!? ও শালা পাতা খেয়ে সব টাকা ক্ষেঁই করে তারপর এখানে এসেছে!”
সবার মাথায় হাত। সাবিত্রীর বুকটা চড়াৎ করে উঠল! তাহলে গনা ওই দুহাজার টাকা পেয়ে হিরোইন খেয়ে উড়িয়েও ফেলেছে!
‘কি জন্য মরল সাবিত্রী? কার জন্যই বা মরল সে? মরেই বা কি লাভ হল তার?’
ক্ষনিকের মধ্যে সাবিত্রীর বাঁচার সখ তীব্র ভাবে জেগে উঠল! এ জগতে কেউ কারো না! কেউ কারো সমব্যথী না! নিজের পেটের টাই যখন বেইমান, স্বার্থপর, তখন কে আর কার? এ জগতে কেউ যদি সমব্যথী হয়ে থাকে সে শুধু নিজের।একান্তই নিজের। সাবিত্রী শুধু একা, একদম একা। শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচতে ইচ্ছে করল। ক্ষোভ,রাগ,দুঃখ,আক্ষেপে চিৎকার করে উঠল সাবিত্রী! বুকটা টেনে সজোরে নিশ্বাস নিল…
শুধু শোল মাছের মতো একবার খাবি কেটে উঠল! চোখ খুলে দেখল তখনো সে হসপিটালের বেডে! মরেনি এখনো! মাঝে শুধু কিছুটা সময়ের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল! সাবিত্রীর চোখে হাজার তারার আলো ঝিলিক মেরে উঠল। মরে গেছে কিনা বেঁচে আছে, সাবিত্রী তখনো বেশ খানিকটা ঘোরে! শুধু এইটুকু বুঝল, নিষ্পাপ মৃত্যুকে বরন করার মতো পুণ্যি সাবিত্রী এখনো করেনি! কোনো এক যুগে সাবিত্রীর প্রার্থনায়, ঈশ্বরের পরম করুণায় সত্যবান প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু এই প্রথম ঈশ্বরের করুণ অভিশাপে সাবিত্রী নবজীবন লাভ করল!
এরপর এক খাবি,দুই খাবি করতে করতে সাবিত্রীর নিঃশ্বাসের সংখ্যা বাড়তে লাগল। ওদিকে ডাক্তার তখনো সাবিত্রীর ভাঙাচোরা বুকটার ওপরে সজোরে পাম্প করে চলেছে….

