ও চাঁদ
স্বপন নাগ
চাঁদ নিয়ে আধুনিক কবিরা আর কবিতা লেখে না। এ নিয়ে এক দল কবির মতে বিষয়টা সেকেলে। সত্যিই তো, চাঁদ কি আর আজকের ! আর এক দলের আবার মনোভাব – চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করব কী !
এও সত্যি ! কী আর করা যাবে। চাঁদ কিন্তু স্বমহিমায় আজও উজ্জ্বল। আজও মায়াবী তার জ্যোৎস্না। সেই চাঁদ, আমার প্রপিতামহের মামা ছিল যে একদিন, তার মামাত্ব বজায় রেখে আসছে বাবার, আমার, ছেলের হয়ে নাতিরও। এমন মামা কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। বাস্তবিকই, এমন মামাবাড়ির আবদার আর কোথায়ই বা আছে।
চাঁদগন্ধী মত অনেক শব্দ আছে, তাদের উৎপত্তির জন্য কতখানি দায়ী চাঁদ, সেটি ভাষাবিদদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু সবচেয়ে কাছাকাছি যে শব্দটি, চাঁদা, সে কিন্তু আমাদের জীবন যাপনের রাস্তায় বিরক্তিকর এক উৎপাত। পড়াশুনোর প্রথম পর্বের জ্যামিতি বক্সের চাঁদা নয়, এ চাঁদায় শুরুশেষে জড়িয়ে আছে পয়সাকড়ি। সারা বছর ধরে কত রকমেরই না চাঁদা। পুজোর চাঁদা, দরিদ্র নারায়ণ সেবার চাঁদা, ‘পাশেই আছি’ ক্লাবের চাঁদা, পার্টির চাঁদা, অনাবৃষ্টির চাঁদা, অতিবৃষ্টির চাঁদা … অগুনতি। সাপ্তাহিক পাক্ষিক মাসিক বাৎসরিক চাঁদারা যেন জীবনকে আঁকড়ে ধরে ছিনে জোঁকের মত। ‘প্রণামী বাক্সে ফেলিবেন’-এর মতই কখনো বাক্সটি আপনার দুয়ারে, কখনো বা রাখা থাকে নির্দিষ্ট ক্লাবঘরে।
চাঁদকে নিয়ে কবিতা না লেখা হোক আজকাল, বিষয় হিসেবে চাঁদ যতই হোক সেকেলে, ‘চাঁদের কপালে চাঁদ টি’ দিয়ে যা’ বলে মা যখন শিশুটিকে ভরিয়ে তোলে আদরে আদরে, খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শিশুটি, আজও। এমনকি, রাগী বউয়ের মানভঞ্জনে চাঁদপানা মুখের প্রশংসা এখনও যথেষ্ট এফেক্টিভ।
পাড়ার মাঠে টাঙানো হয়েছে চাঁদোয়া। সেইসঙ্গে ল্যাম্পপোস্টে মাইকের চোঙ। এই রে ! চাঁদার সম্ভাব্য আতঙ্কে কেঁপে ওঠে চন্দ্রকান্ত বিশ্বাসের নিম্নমধ্যবিত্ত বুকের হাপর। প্রবল শীতেও তেতে ওঠে তার বিরলকেশ চাঁদি। চাঁদার বিল হাতে ওই তো একদল ছেলে এগোচ্ছে এদিকেই। চন্দ্রকান্ত তখন ঘরের কালীকে পরাচ্ছেন চাঁদমালা। বলিপূর্বের পাঁঠার মত বউয়ের কাছে সকম্প নিবেদন, ‘আমি নেই। তুমিই সামলে নাও।’ অনেক কাকুতি মিনতি শেষে রেজাল্ট, ‘বিল রইল। চাঁদুদাকে বলবেন ক্লাবে দিয়ে আসতে।’
পুজো সেরে চাঁদু এখন চায়ের কাপ হাতে টিভির সামনে। টিভিতে কী হচ্ছে, সিরিয়াল ? খবর ? খেলা ? কিছুই মাথায় ঢুকছে না। বিলটা দেখল আর একবার। পাঁচ শ’ এক। চাঁদু উঠে দাঁড়াল। যা খুশি তাই ! বসে পড়ল আবার। কিন্তু কী করতে পারে সে ? বড় অসহায় লাগে। টিভি বন্ধ করে দিল। বন্ধ করে দিল জানালাগুলোও।
রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে বিছানায় যেতে যেতে দশটা। বিপন্ন চন্দ্রকান্ত আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়েও পড়ল। এমন দুর্দিনে এখনও চন্দ্রকান্তের চোখে স্বপ্ন।
সে দেখল, মাঝরাত্তিরে বেরিয়েছে নৌকোবিহারে। একই নৌকোয় সওয়ার হলিউড আর বলিউডের ঝলমলে নায়িকারাও। এদিকে স্কারলেট জোহানসন, এলিজাবেথ হার্লে তো ওদিকে মাধুরী দীক্ষিত, বিপাশা বসু। একেবারে চাঁদের হাট। মেরিলিন মনরো চন্দ্রকান্তের কাঁধে হাত রেখে আঙুল নির্দেশ করে দেখাচ্ছে চাঁদের গা ঘেঁষে পাতলা ফিনফিনে মেঘের উড়ে যাবার স্বর্গীয় দৃশ্য। একটু দূরে দাঁড়িয়ে মধুবালা। ইশারায় ডাকছে তাকে। চাঁদপাল ঘাট থেকে নৌকোয় ভেসে ভেসে এখন তারা মাঝগঙ্গায়। মাথার ওপর অজস্র তারায় সাজানো রাত্রির সালঙ্কারা আকাশ। চাঁদনি রাতের জোছনায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। গঙ্গার ঢেউয়ে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে চাঁদের ছায়া। চন্দ্রনাথের গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে, ‘ও চাঁদ, সামলে রাখো জোছনাকে…’
ঘুম ভেঙে যায় কী এক শব্দে। চন্দ্রকান্ত পাশ ফিরে শোয়। তারপর আরও কিছু সময় আলস্যে শুয়ে থাকে। স্বপ্নের কথা ভাবে। ভাবে, শালা দুনিয়ার সমস্ত না-পাওয়া মানুষগুলোর কাছে স্বপ্নই যেন চাঁদমারি।

