ছোটগল্পঃ মানব -ইন্দ্রাণী দত্ত পান্না (কলকাতা)

মানব
ইন্দ্রাণী দত্ত পান্না

লোকটা চারদিকে তাকিয়ে  বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে তার সরু গোঁফ ঠিক করে নিয়ে দ্রুত সামনে কয়েক পা এগিয়ে গেল। সরু কব্জি, বাদামী চামড়ার তলায় ঠেলে উঠতে চাওয়া শিরার আঁকাবাঁকা নক্সা,পাতলা পেট,ঢোলা শার্টের তলায় অবধারিত পাঁজর বের করা বুক  (বড় জোর ছত্রিশ ইঞ্চি)।এসবই লোকটার নিজের। এক্কেবারে নিজের। হাঁটার সময় সে চেষ্টা করছে মাথাটা অল্প তুলে রাখার। বুক একটু টান করে রাখতে। কিন্তু তার এই চেষ্টা বেশ হাস্যকর মনে হচ্ছে বাকিদের। পেছনের সীটগুলোর দিকে না গিয়ে লোকটা কয়েক ধাপ নেমে একেবারে সামনের সারিতে গিয়ে বসল। একজন ভলেন্টিয়ার দৌড়ে এসে কী যেন বলল লোকটাকে। পাঁচ রো পেছনে বসে নীলপর্ণা বেশ বিরক্ত মুখে মাঝে মাঝেই খেয়াল করছিল লোকটাকে। এখন অডিটোরিয়াম ভরে এসেছে। এই আবাসনে এই এ সি হলটাও একটা আকর্ষণ। মাঝে মাঝে  নানারকম অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। গ্রীনরুম থেকে খবর পেয়ে গেছে সে বিখ্যাত বাংলা ব্যান্ড এসে গেছে। সোসাইটির প্রেসিডেন্টের বাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছে। ওদিকে রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী এসে যাবেন মিনিট দশেকে মধ্যে। নাটকের দল মেক আপ নেয়া শুরু করে দিয়েছে। প্রথমে একটা গান হবে। নীলপর্ণার ছেলে মেয়ে দুজনেই গাইবে। ক্লাসে স্ট্যান্ড করে বলে ছেলে প্রাইজ পাবে। এত কিছু সত্বেও সামনের সারিতে বসার সুযোগ সে পায়নি। কোত্থেকে ঐ লোকটা গিয়ে বসে রয়েছে। আরও একটা আকর্ষণ আছে আজকের সন্ধ্যার, রঞ্জন রায় কে সংবর্ধনা দেয়া হবে। নীলপর্ণার খুব দেখার ইচ্ছে ভদ্রলোককে। শিঞ্জিনীর কী হতো উনি না বাঁচালে? ভাবা যায়না, তরতাজা টগবগে মেয়েটা গ্যাং রেপড্ হয়ে যেত। এদিকে ওদের আবাসনের পরে বেশ কিছুটা জায়গা ঝোপ ঝাড়, কলা বাগান, ঝুপসি ঝুপসি গাছ। একটা গাছেরও নাম জানেনা  আগাগোড়া শহুরে নীলপর্ণা ।একটা নোংরা ঘোলা জলের খালের মতো চলে গেছে  পূব-পশ্চিমে। কিন্তু অভিরূপের ইচ্ছেয় এই ” প্রকৃতির কোলে” “আপন নীড়” আবাসনে বাস করতে আসা। দেখতে দেখতে চার বছর হয়ে গেল। কলকাতার দূরত্ব কুড়ি মিনিট বড় জোর।  ই এম বাইপাস সাত আট মিনিট। মেট্রো রেলও এসে যাবে একদিন। কিন্তু   4/6/c এর শিঞ্জিনী কথা ভাবলেই মাথাটা কেমন অবশ লাগে। নিজের মেয়েটার কথা ভাবলে বড় ভয় করে। এখন তো সব বয়সের সব মেয়েদের, যে কোনো পুরুষ থেকে সাবধানে থাকতে হয়। সমাজটা কোথায় যাচ্ছে। রঞ্জন রায়ের মতো সাহসী মানুষ কজন আছে? অভিরূপই কি বাঁচাতো কাউকে এতটা  রিস্ক নিয়ে? তিনটে ছেলে ছিল,একজন পাহারা দিচ্ছিল গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। একটু দূরেই ছিলেন রঞ্জন রায়, সাইকেলে ফিরছিলেন। ঝোপের আড়ালে মেয়েটির গোঙানি শুনে। সাইকেল থেকে নেমে পড়েন। অন্ধকারে এগিয়ে গিয়ে বুঝতে পারেন ঘটনাটা। নামার সময় সাইকেলের পেছনে রাখা লোহার রডটা নিতে ভোলেন নি। রাতে ফেরার সময় সাপ টাপ আর পাগলা কুকুরটার জন্য এই ব্যবস্থা। আবছা অন্ধকারে নিঃশব্দে গায়ের জোরে মাথা লক্ষ্য করে রডটা দিয়ে আঘাত করেন। ছেলেটা লুটিয়ে পড়ে প্রচন্ড আর্তনাদ করে। যে ছেলেটা মেয়েটার হাত দুটো মাটিতে চেপে ধরে রেখেছিল সে স্প্রিং লাগানো পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠেই দৌড় লাগায়। মেয়েটিকে এক টানে মাটি থেকে তুলে রঞ্জন রায়ও দৌড়তে থাকেন। পাহারাদার ছেলেটা খানিকটা তেড়ে আসে। মেয়েটিকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে মাথার ওপর রডটা ঘুরোতে থাকে, বাতাসে শব্দ ওঠে। রঞ্জনের হঠাৎ খেয়াল হয় ছেলেটা হাতে একটা বড় ছুরির মতো কিছু। দূরের ধাবমান গাড়িগুলো আলোয় সেটা চক চক করে উঠছে। হঠাৎ সে হাতের রডটা ছুঁড়ে দেয় ছেলেটার বুক লক্ষ করে। অব্যর্থ নিশানা। ছেলেটা চিৎ হয়ে পড়ে যায়। শক্ত করে মেয়েটির হাত ধরে সে বলে, “কোনো ভয় নেই। ওরা পারবে না আমার সাথে। আমি ঠিক আপনাকে বাঁচাব।”
একটু পা চালিয়ে রাস্তায় উঠতে হবে। পায়ে একটা ইঁটের মতো কিছু লাগে। তুলে নেয় রঞ্জন ।  একটা গোটা ইঁট।এগিয়ে যান পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে,  সজোরে একটা হাঁটুতে আঘাত করেন ইঁট দিয়ে। ছেলেটা ককিয়ে ওঠে। আর একটা হাঁটুতে আবার আঘাত করেন। যাতে সহজে উঠে বাধা না দিতে পারে। একটু সময় বেশি পাবার চেষ্টা। মেয়েটিকে নিয়ে দৌড়ে এসে সাইকেলটা তুলে নেন। মেয়েটিকে বসিয়ে জোরে চালাতে শুরু করেন। সেই রডটা মাঠেই পড়ে রইল। আর খানিক দূরেই আবাসন গুলোর আলো দেখা যাচ্ছে। শিঞ্জিনীর এতক্ষণে হুঁস হয় ওর ব্যাগটা কোথাও পড়ে গেছে। মোবাইলটাও গেছে ঐ সঙ্গে। বড় রাস্তায় উঠে সে রঞ্জন রায় কে বলে “আপনার কাছে ফোন আছে?” লোকটি সাইকেল থামিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে একটা ফোন  বার করে। শিঞ্জিনী তার বাবাকে ফোন করে কিন্তু বলতে পারে না কিছু, ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। লোকটি ফোনটি নিয়ে  অতি সংক্ষেপে বলে,   “আপনার মেয়ের একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। আমি কোনো ভাবে ওকে উদ্ধার করেছি । আপনাদের ঠিকানাটা দিন পৌঁছে দেব।” শিঞ্জিনী হাত দিয়ে দেখায় তার আবাসন।
  তারপর  বাড়িতে এসে শিঞ্জিনী বলে সব ঘটনাটা।  কী করে ওরা তাকে একা হাঁটতে দেখে  হ্যাঁচকা টানে গাড়িতে তোলে তারপর অন্ধকার মাঠ, ঝোপ -জঙ্গল, আর রঞ্জন রায়ের  লড়াই। রঞ্জন বলেন,  ওকে একবার হসপিটালে নিয়ে যান তার আগে পুলিশকেও জানানো দরকার। আমিও সব কথা বলব। একজন পালিয়েছে। বাকি দুজনকে ঘায়েল করছি ঠিকই। কিন্তু এতক্ষনে হয়তো পালিয়েছে । আমি দেখি পাড়ার লোকদের কয়েকজনকে ফোন করি ” শিঞ্জিনী বলে, আগে পুলিশে যাব যাতে ওরা গাড়িটা বা অজ্ঞান লোকটাকে তুলতে পারে।” শিঞ্জিনীর বাবা আবাসনের সেক্রেটারি, আর পাশের ফ্ল্যাটের দীপঙ্কর মন্ডল কে ডেকে নেন।  রঞ্জন রায় কে  পুলিশ যেন হেনস্থা না করতে পারে। গাড়ি বের হয় দুটো । রঞ্জন রায় গাড়িতে বসে জানায় পেছনের গ্রামটাতে তার বাড়ি। হসপিটাল মোড়ে চা খাবার আর ডাবের দোকান তার। রোজ নটায় বন্ধ করে। শিঞ্জিনী এত রাতে বাড়ি ফেরে কেন সে নিয়ে অনুযোগ করে। কথায় কথায় জানতে পারে শিঞ্জিনী একজন গবেষক। মাথায় রডের আঘাতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ছেলেটাকে রঞ্জনের গ্রামের ছেলেরা  ঘিরে ছিল। পুলিশ গিয়ে তোলে।  সকলে মিলে রঞ্জন রায়কে  পুলিশের ঘোরালো প্যাঁচালো প্রশ্নের  হাত থেকে রক্ষা করে। আর অন্যজন আর গাড়ি কোনোটাই নেই। বাকিদের সন্ধান একে জেরা করে বের করে নেবে আশ্বাস দেন অফিসার। তারপর কেস হবে। রোজ এই অঞ্চলে পেট্রোলিংএর ব্যবস্থা করবেন কথা দেন।
     গল্পটা নীলপর্ণা অভীকের কাছে শুনেছে। কাগজে বড় করে রিপোর্ট করতে দেননি শিঞ্জিনীর বাবা। প্রায় আট মাস আগের ঘটনা। এখনো অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। শিঞ্জিনীরা এখন কলকাতার পুরোনো বাড়িতে থাকে বেশির ভাগ সময়।  মেয়েটা না কি আসতে চাইছে না। মাঝে মধ্যে ওর মা বাবা আসেন।  স্টেজে এখন পুরস্কার দেয়া চলছে। ছেলেটাকে কাছ থেকে দেখে একটা স্ন্যাপ নেবার জন্য সামনে এগিয়ে যায় নীলপর্ণা।
ইচ্ছে করেই লোকটার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার একটু সরে যায় কয়েকজনের আপত্তিতে। হঠাৎ দেখে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসতে অনুরোধ করছে। বলছে,” দিদি বসুন, এখান থেকে সব ভাল দেখা যাচ্ছে।” একটুও অপ্রস্তুত না হয়ে শিঞ্জিনী বসে পরে। একটা ধন্যবাদও দেয়া হয়না ছেলের ছবি তুলতে গিয়ে। পুরস্কার বিতরণ হয়ে গেছে। এইবার সম্বর্ধনা। মাইকে নাম ঘোষনা হলো। সাহসী,নিঃস্বার্থ, বুদ্ধিমান ও উজ্জ্বল হীরে বলে। আসল হিরো হলেন রঞ্জন রায়ের মতো মানুষরা। শিঞ্জিনী টান টান উত্তেজনা নিয়ে স্টেজের মাঝখানের চেয়ারটায় তাকিয়ে রইল। শিঞ্জিনীর বাবা একজনকে  নিয়ে স্টেজে এলেন। আরে এতো ঐ দুবলা পাতলা,  বেঁটে চেহারার লোকটা। নীলপর্ণার হাঁ আর বন্ধ হয় না। হাত তালিতে হল ফেটে পড়ছে। লোকটি জোড় হাত করে সবাইকে নমস্কার করছে।  মালাটি হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দিল। ফুলের তোড়াটা টেবিলে রেখে দিচ্ছে  শাল মিষ্টি,স্কুটারের চাবি ,সব রেখে দিচ্ছে টেবিলে… এই রঞ্জন রায়! এবার রঞ্জন রায়ের পাশে নিয়ে আসা হলো জড়সড় এক মহিলাকে। ইনি রঞ্জনের মা। রঞ্জন রায় এখন খুবই কুন্ঠিত হয়ে আবাসনের জিম করা, সুইমিং পুলে  হুল্লোড় করা ,  ক্রিকেট খেলা,আর বড় চাকরি করা তরুণদের  জোড় হাত করে অনুরোধ করছে মা বোন স্ত্রী বা কোনো নারীর অপমান এবং তাদের ওপর অত্যাচার যেন তারা জীবন দিয়ে হলেও প্রতিরোধ করেন। প্রতিটি মা কে অনুরোধ করছেন যেন তাঁরা ছেলেদের শিক্ষা দেন মেয়েদের অসম্মান না করতে। বলছেন ছোটো বেলা থেকে তাঁর মাও এই  কথাই বার বার বলেছেন। ঘুরে না দাঁড়ালে অন্যায় গুলো চলতেই থাকবে।
  নীলপর্ণার হাতদুটো কখন জোড় হয়ে  গেছে। এই মানুষটাকে নমস্কার করা যায়। সব শিক্ষার সেরা শিক্ষাটি তিনি পেয়েছেন আর তার সুফল পেয়েছে এই আবাসনের  একটি মেয়ে। ভিড়ের মধ্যে নিজের ছেলেমেয়েকে খুৃঁজছে তার চোখ। এই মানুষটিকে সারা সন্ধে সে অবজ্ঞা করেছে, রাগ করেছে। ছেলে মেয়ে অভীক সকলকে নিয়ে সে একবার লোকটির কাছে যেতে চায়। প্রাণ ভরে ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানানো বড় দরকার। আর অস্ফুটে একটু ক্ষমাও চাইতে হবে।

7 thoughts on “ছোটগল্পঃ মানব -ইন্দ্রাণী দত্ত পান্না (কলকাতা)

  1. অপূর্ব। সমাজ বদলের লড়াই চালিয়ে যেতে হবে রঞ্জন রায়েরদের হাত ধরে।

    1. এই রঞ্জনদের মতো মানুষরা আছে বলেই পৃথিবী এখনও সুন্দর।
      খুব ভালো লাগলো গল্পটা।

  2. এখন মানুষের মধ্যে ভগবান খোঁজার প্রয়োজন নেই। সত্যিকারের মানুষের বড় অভাব। খুব ভাল লাগল।

    1. খুব ভালো লাগলো। লেখক একটি সদর্থক বার্তা দিয়েছেন লেখার মাধ্যমে। সমাজের অবক্ষয় রুখতে এভাবেই এগিয়ে আসা দরকার সকলকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *