ছোটগল্পঃ বিকেল বেলা- নরেশ মল্লিক

অবশেষে এ্যপয়েন্টমেন্ট লেটারটা হাতে পেলো লোকেশ মন্ডল। একদম শেষ বয়সে। আর কয়েকটাদিন গেলেই চাকরীর বয়স পেরিয়ে যেত। এস.সি কোটায় চাকরী। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। সেই গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর থেকেই একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু রিটেনে পাশ করলেও ভাইভার গন্ডী পেরোতে পারছিলো না। যখন বাইশ থেকে পঁচিশ বছর বয়স রক্ত টগবগ করে ফুটছে তখন একবারের জন্যেও মনের জোর হারায়নি লোকেশ। শেষ দিকে এসে সেই মনের জোরে একটু ভাঁটা পড়লেও আশা একদম ছাড়েনি।

— কী রে রিটেনে পাশ করেছিস? গ্রাম তুতো এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল।

— পরীক্ষা তো ভালোই দিয়েছিলাম কিন্তু কেন যে পাশ করলাম না কে জানে ?

— আরে এই ভাবে বাড়িতে পড়ে হবে না। একটা কোচিং এ ভর্তি হয়ে যা।

— ধূর কোচিং। চাকরী হলে বাড়িতে পড়েই হবে। ঐ সব কোচিং ফোচিং নিয়ে হবে না।

— হ্যালা করিস না। একটা ভালো কোচিং এ ঢুকে যা। দুবরাজ পুরের শুভ দা কোচিং এ ঢোকার পরেই চাকরীটা পেল।

তখন বিষয়টা বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছে লোকেশ। কোচিং নিলে হয়তো এই শেষ বয়সে এসে চাকরী পেতে হোত না। আজ থেকে দশ বছর আগে চাকরীটা পেত। এতদিনে গাড়ী, বাড়ি, ব্যাঙ্ক, ব্যালেন্স অনেক কিছু করতে পারত। হাত খরচের জন্য পেনশন পাওয়া মায়ের কাছে হাত পাততে হোত না। বিশুর দোকানে চা, বিস্কুট ও সিগারেট খেয়ে ” বিশু পয়সাটা দুদিন পরে দেব। ” বলতে হোতো না। কিন্তু কি আর করা যাবে। বরাতে আছে তার শেষ বয়সে চাকরী। যেমন চাকরী পাওয়ার আগে তার বরাতে ছিল,

— মায়ের পয়সায় বসে বসে ছেলে বৌকে আর কত দিন খাওয়াবে। নিজে একটা কিছু করো। আমি রোজ রোজ শাশুড়ি মায়ের কাছে হাত খরচ চাইতে পারবো না বলে দিলাম।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে কি একটা ক্রিম মাখতে মাখতে অনামিকা ওরফে অনু কথাগুলো বলল। যাকে বলল সেই লোকেশ কথাগুলো শুনলো কিন্তু কতটা বুঝতে পারল সেটা বোধগম্য হলো না অনুর।

— এরপর বেশী দেরী করলে দুটোর ট্রেনটাও মিশ করবো। লোকেশের এই কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে অনু মাথাটা আঁচড়াতে লাগলো।

— মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়েছো? অনু বলল।

— না না। গতকাল প্রাইভেট পড়ানোর দুই মাসের মাইনে পেয়েছি। হয়ে যাবে।

— প্রাইভেট পড়ানোর মাইনে বলতে তো আড়াই হাজার টাকা ওতে তো তোমার ছেলের টিফিন খরচই লেগে যাবে। দেখা আর খাওয়া দাওয়ার খরচা কে দেবে?

— ঠিক আছে, ঠিক আছে। যাওয়ার সময় মায়ের কাছ থেকে কিছু নিয়ে নিচ্ছি।

সকাল বেলা ঘুম থেকে একটু তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল লোকেশ। স্নান করে পূজো দিয়ে কিছু খেয়ে স্কুলে গেল জয়েন করতে।

প্রাচীর দিয়ে ঘেরা স্কুল। একতলা। অফিস সহ পাঁচটা রুম। সামনে একটা ছোটো খেলার মাঠ। সেখানে বেশ কয়েকজন ছেলে মেয়ে ছোটাছুটি করছে। কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী সাইকেলে করে বিক্রি করতে আসা ফেরিওয়ালার থেকে পাপড় কিনে খাচ্ছে। লোকেশ ধীরে ধীরে স্কুলে প্রবেশ করল। মিড ডে মিলের রান্না হচ্ছে পাশের একটা ঘরে। সদ্য হওয়া ভাতগুলো একটা ঝুড়িতে ঢেলে রাখা হয়েছে ফ্যান ঝরার জন্য। পাঁচফোড়নের গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। এবার বোধহয় সোয়াবিনের তরকারি হবে। রান্না ঘর থেকে একজন মহিলা বেরিয়ে এলো। লোকেশকে দেখে বলল,

— আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?

— আমি এই স্কুলের নতুন টিচার। আজ জয়েন করতে এসেছি। লোকেশ বলল।

— অ। বলে মহিলাটি রান্না ঘরে ঢুকে পড়ল। ” গ্যাসটা একটু কমিয়ে দে। ” কাকে যেন নির্দেশ দিল। বাইরে থেকে শুনতে পায় লোকেশ। লোকেশ যে নতুন শিক্ষক হয়ে এই স্কুলে জয়েন করতে এসেছে তা যেন মহিলাটিকে খুশি করতে পারেনি। খুশি লোকেশ নিজে হয়েছে মাঝ বয়সে চাকরী পেয়ে। ধীরে ধীরে অফিসের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভিতরে চেয়ারে বসে এক ভদ্রলোক। বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। মাথায় একটা চুলও নেই। যা আছে মাথার পিছনের দিকে। কথায় বলে “ছাদ খালি বাম্পার ভীড়” সেই রকম আর কি! চশমাটা নাকের কাছে নামিয়ে একটা কাগজে কী যেন লিখে চলেছেন। অন্য হাতে সদ্য ধরানো একটা বিড়ি। তাতে মাঝে মাঝে টান দিচ্ছেন আর তার থেকে উৎপন্ন ছাইগুলো মেঝেতে ফেলছেন। লোকেশ মনে মনে ভেবে নেয় ইনিই হেড মাস্টারমশাই।

— আসব স্যার?

হেড মাস্টার মশাই আগন্তুকের দিকে না তাকিয়ে বিড়িতে টান দিয়ে লিখতে লিখতেই বললেন, — হ্যাঁ আসুন। লোকেশ ঘরে ঢুকল।

— বসুন।

— আমি লোকেশ। লোকেশ মন্ডল। এই স্কুলে নতুন টিচার হিসেবে জয়েন করতে এসেছি।

সঙ্গে সঙ্গে হেড মাষ্টারমশাই অগ্নিদগ্ধ বিড়ির শেষ অংশটা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে বললেন,

— আরে আসুন আসুন। ঐ চেয়ারটায় বসুন। আর বলবেন না মশাই। যা চাপ চলছে। মিড ডে মিলের হিসেবটা করছিলাম।

— স্কুলে আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। অন্য টিচাররা —

হেড মাষ্টারমশাই লোকেশের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন,

— আর একজন দিদিমণি আছেন। তা ওর কোন এক আত্মীয়ের বিয়ে বলে চারদিন ছুটি নিয়েছেন। কী করে চালাই বলুন তো। এস আই সাহেব বলছিলেন আমাদের একজন টিচার দেবে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি যে সেটা হয়ে যাবে আমি বুঝতে পারিনি।

লোকেশ স্কুলের দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে এগারোটা কুড়ি বাজে। হেড মাষ্টারমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো স্যার?

— বলুন বলুন। হেড মাষ্টারমশাই চশমাটা নাকের থেকে উপরের দিকে তুলে দিয়ে বললেন।

— এখন কি টিফিন আওয়ার্স?

— না না। এই তো প্রেয়ার শেষ হল। হাতের কাজটা শেষ করে সবাইকে এক জায়গায় বসিয়ে আমি ক্লাস নেব।

দুই বার ঢোক গিলে লোকেশ বলল — না মানে ছাত্র ছাত্রীরা সব খেলা ধূলো ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে তো তাই।

— আর বলবেন না। সর্ব সাকুল্যে আমাকে নিয়ে দুই জন টিচার। তাও তো একজন বিয়ে বলে ছুটি নিয়ে বসে আছে। কী করে সামালাই বলুন তো? তাও তো সামনের বছর প্রথম দিকে আমি রিটায়ার করবো। ও লবঙ্গের মা ছেলে মেয়েদের সব ঘরে ঢুকে বসতে বলো। দেখি আপনার এ্যপয়েন্টমেন্ট লেটারটা —

লোকেশ ফাইল খুলে সমস্ত কাগজ পত্র দেখায়। বেশ কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখেন হেড মাষ্টারমশাই। — সে কি মশাই একদম বর্ডার লাইনে এসে চাকরীটা পেলেন? ধন্য মশাই আপনি। কপালের জোর আছে।

— কপালের জোর – ই বটে। আমি তো ভেবেছিলাম এত দূর লেখা পড়া শিখেছি চাকরী আর জুটবে না। অবশেষে বিড়ালের ভাগ্যে ছিকে ছিঁড়ল।

— খুব ভালো হলো লোকেশ বাবু। স্কুলটা বেঁচে যাবে। এই গ্রামের লোকজন খুব গরীব। মাঠে, ইঁটভাটায় কাজ করে। অনেক ছেলে মেয়ে আছে যারা বাড়িতে দুই বেলা পেট ভরে খেতেও পারে না। তাছাড়া দুই জন টিচার মিলে কি একশ জন ছাত্র ছাত্রীকে সামালানো যায়?

সমস্ত ফর্মালিটি সম্পূর্ণ হলো। হেড মাষ্টারমশাই লোকেশের দিকে তাকিয়ে বললেন — তাহলে আজকের থেকেই ক্লাস শুরু করে দিন।

একটা সূর্য আকাশে উঠলে একশ অমাবস্যার অন্ধকার দূরীভূত হয়। আজ যেন লোকেশের জীবন আকাশে একটা সূর্য নয় হাজার সূর্য উঠে ওর অন্ধকারময় জীবনটা আলোকিত করে তুলল। লোকেশ উঠে পড়ে ক্লাস নেওয়ার জন্য।

আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরে ঘরে ঢুকল অনু। শাড়ীটা ছেড়ে একটা সুন্দর নাইট ড্রেস পড়ে নিল সে। লোকেশ এক ঝলক দেখে নিল অনুকে। খুব খুব সুন্দর এবং মিষ্টি লাগছে ওকে। অনুও এক মুখ হাসি নিয়ে লোকেশের পাশে শুয়ে পড়ল। স্বামীর গলা জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে বলল — আজ প্রথম দিন কেমন কাটলো তোমার স্কুল।

— ভাল। তবে অনেক খাটতে হবে অনু। পিছিয়ে পড়া গ্রাম। তাই ছেলে মেয়েগুলো পিছিয়ে পড়েছে। স্কুলে ওরা শুধু আসে একটু পেট ভরে খাওয়া আর খেলাধূলো করার জন্য। ওদেরকে শিক্ষাটা দিতে হবে। লোকেশ স্ত্রীর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল।

— শিক্ষকতাকে তুমি আজীবন শ্রদ্ধা করে এসেছো। এটা তোমার কাছে একটা মস্ত বড়ো চ্যালেঞ্জ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি এই চ্যালেঞ্জকে সাকসেসফুল করতে পারবে।

— প্রথম মাইনে পেয়ে মায়ের জন্য একটা সুন্দর শাল আর তোমার জন্য একটা সোনা দিয়ে শাখা বাঁধানো কিনে দেব।

— আমার আর কিছু চাই না গো। আমাদের দুইজনের জীবনেই দুপুর পার হয়ে গেছে। এখন তো বিকেলে এসে দাঁড়িয়েছি।তুমি আমাদের ছেলে আর তোমার স্কুলের পিছিয়ে পড়া ছাত্র ছাত্রীদের জন্য কিছু করো। তাহলেই আমার সমস্ত সখ মিটে যাবে।

লোকেশ স্ত্রীকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *