ঝরা পাতার বিভ্রাট
কবিতা সামন্ত
কথায় আছে যতটা না ঘটে তারও বেশি রটে। হুজুগে বাঙালি সবসময়ই হুজুগে কথায় বিশ্বাস করে বেশি। এই যেমন ধরুন কেউ আপনাকে বলল আপনার কানটি নাকি কাকে নিয়ে গেছে, এইবার আপনি নিজের কানে আগে হাত না দিয়েই কাকের পিছন পিছন দৌড় শুরু করলেন! তেমনি হয়েছে আজকের বিষয়।
দত্ত গিন্নি বিয়ে ইস্তক আজ অবধি গ্যাসে ছাড়া রান্না করেননি কোনদিন,অথচ গ্যাস নিয়ে নানান হুজুগে রটনা শুনে শ্বশুরের লাগানো শাল সেগুন আরও নানান গাছের বাগানে কোনদিন উঁকি পর্যন্ত দেননি। দুনিয়ার জ্বালানি সব ওই দূরে দুলে বাগদীরাই সবদিন টেনে টুনে নিয়ে যায়।
শ্বশুর মশাই থাকতে এই গ্যাসে রান্না নিয়ে কতইনা কথান্তর হয়েছে তা সত্বেও দত্ত গিন্নি কখনো গা-ই করেনি। তার নাকি উনুনে জ্বালানিতে রান্না করলে হাতে কালি লেগে যাবে বা ধোঁয়াতে নাকি ওই কিসব এলার্জি টেলার্জি হয়। বাব্বা,সে কতইনা কাণ্ড হতো তখন।
আর বুড়োটাও ছিলো তেমনি ত্যাঁদড়, এমনিতেই বুড়িটা সবসময় বুড়োকে খ্যাচ খ্যাচ করত তারওপর বুড়ো ছেলের বৌয়ের পিছনে কাঠি করত। আর বৌটাও পড়েছে তেমনি। একটা কথা শোনালে দশটা কথা শুনিয়ে ছাড়ত। শুনেছিলাম দত্ত গিন্নির বাপের বাড়ি বেশ বড়লোক,তাই কারোর কোন কথার ধার সে ধরতো না। তবে বুড়ো বুড়ির সেবায় কোন খামতি সে রাখত না। সুনীল দত্ত,ওই দত্ত গিন্নির কর্তা,বেশ ভালো মাইনের সরকারি চাকরি করে, সেই জন্যই দত্ত গিন্নির দেমাগে যেন মাটিতে পা পড়ত না। সেই ভালো মানুষের ব্যাটা নাকি বাবা মা আর বৌয়ের মধ্যে কখনো নাক গলাতনা।
সে ভালো করে জানত যে চাকু তরমুজের ওপর পড়ুক বা তরমুজ চাকুর ওপর কাটা কিছু তরমুজকেই পড়তে হবে তাই কোনদিন কারোর পক্ষ ধরে কথা বলতনা।
যাকগে,অত শত কথায় কাজ নেই। এখন দত্ত গিন্নির কথা বলা যাক। এই যে সব যুদ্ধ টুদ্ধ আরও কি যে সব গ্যাস ট্যাস নিয়ে সমস্যা চলছে সেই সব কথা শুনে দীর্ঘ কুড়ি বছর পর দত্ত গিনি লম্বা লম্বা শাল সেগুনের বাগানে এসে দেখে দুলে বাগদীরা বাগানে শীতের পর এই বসন্তে যত গাছের শুকনো ডাল পাতা ঝরে পড়েছে সব ওরা তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে,দেখে দত্ত গিন্নি ওদেরকে সেই সব জ্বালানি রাখতে বলে,ওরা এপর্যন্ত কোনদিনও দত্ত গিন্নিকে দেখেনি তাই ওরা কোন কথা শুনতে নারাজ।
ওরা বলে ওটি হচ্ছে নে, তাছাড়া তুমি কোথা থেকে উদয় হলেগা?তোমাকে তো দেখে আমাদের মতো পাতা কুড়োনীও লাগচেনে! দেখে তো ভদ্দর নোকের ঘরের বৌ বলেই মনে হয়,তবে তোমার এই পাতা কুড়োনোর শক কবে থিকে হলো গা?আমাদের হকে ভাগ বসাতে আসবেনে মটেও বলে দিচ্চি। উঠল বাই তো কটক যাই, নাও এবার ঠেলা। ওদের কথা শুন তো অবাক দত্ত গিন্নি,কথাবার্তা ভাষার যা ছিড়ি,তাছাড়া জোর যার মুলুক তার!এ কি আশ্চর্য ঘটনা! এইজন্যই বোধহয় শ্বশুর মশাই এতো চেঁচামেচি করতেন এখন দত্ত গিন্নি বেশ বুঝতে পারছে। সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলে ওঠে তোদের সাহস তো বটে মন্দ নয়,এ তো দেখছি যার শীল যার নড়া তারই ভাঙে দাঁতের গড়া! বলি তোরা আমারই বাগানে আমাকেই এসব কথা বলার সাহস পাস কোথ্থেকে? ভালোই ভালোই মানে মানে বলছি সব জ্বালানি রেখে যা।
তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল হুঁউউউ,কোথা থিকে এলো রে আমার বাগানের মালিক! আমাদের দিকে গুল মারতে হবেনে, আমরা সব জানি, ওই বজ্জাত বুড়ো কবেই মর ভূত হয়ে গেছে। আর তাদের ঘরের বৌরিটা নাকি শুনেচি বেশ লাটসাহেবে ঝি, শ্বশুর বেঁচেবর্তে ছিলো যখন তখনই এইসব নিয়ে মাথা ঘামায়নে আর এখন নাকি সে আসবে এই বনে বাদারে পাতা কুড়োতে? যাওতো বাপু যাও, কাজের সময় আমারদিকে বিরক্ত করুনি যাও। দত্ত গিন্নি এবার বেশ চটে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে হাতের ফোনটা নিয়ে কাকে যেন বলে লাঠিসোটা নিয়ে আসতে আর এই দুলে বাগদীদেরকে বেশ করে ঘা কতক দিয়ে যেতে, ওরা যেইনা শুনেছে অমনি সবাই বলে সত্যি সত্যিই এই সেই বজ্জাত বুড়োর ছেলে বৌ?এই সব চ চ চ তাড়াতাড়ি এখান থেকে ভাগ,না হলে একটা মারও বাইরে পড়বেনে বলেই সবাই যে যার থলে ঝাঁটা যা যা ছিল সব নিয়ে পগার পার।

