রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, এক বোহেমিয়ান রোমান্টিক কবির নাম
পার্থ রায়
আমরা যারা এই বাংলায় বাম আমলে আমাদের তারুণ্য এবং যৌবনকাল বা কলেজ জীবন অতিবাহিত করেছি তাদের বেশির ভাগের মনে ‘কবি’ বলতে যে অবয়ব গড়ে উঠেছিল সেটা অনেকটাই সার-রিয়ালিসটিক্ বা পরাবাস্তববাদী। কল্পনার মায়াজালে আঁকা এক অবয়ব। কবি মানেই দরিদ্র, মলিন পাঞ্জাবি পায়জামা পরা, বিড়ি সিগারেট খাওয়া একজন সৎ মানুষ। অনেকটা একজন সৎ মার্কসবাদী কমরেডের মতো। কবি মানেই ছন্নছাড়া, বোহেমিয়ান অথচ ভীষণ ভাবে রোম্যান্টিক। কবি মানে এমন এক অমোঘ ‘কানহাইয়া’ যে এক প্রেমিকাতে আবদ্ধ থাকে না। কবি হল এক ‘অসংসারী’ অথবা অন্যভাবে বলা যায় এমন একজন মানুষ যার হৃদয়ের আগুনে আত্মাহুতি দেবার জন্য তরুণী যুবতীরা উন্মুখ অপেক্ষায় প্রহর গোনে। বাস্তবে সব কবি এমন নন। কেউ কেউ অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেন।
অনেকটাই এমন একজন কবি ছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ যার প্রেমিক কলম থেকে বের হয়,
১) “ভালবাসার সময় তো নেই
ব্যস্ত ভীষন কাজে,
হাত রেখো না বুকের গাঢ় ভাজে”।
২) “খুব কাছে এসো না কোন দিন
যতটা কাছে এলে কাছে আসা বলে লোকে
এ চোখ থেকে ঐ চোখের কাছে থাকা
এক পা বাড়ানো থেকে অন্য পায়ের সাথে চলা
কিংবা ধরো রেল লাইনের পাশাপাশি শুয়ে
অবিরাম বয়ে চলা ।
যে কাছাকাছির মাঝে বিন্দু খানেক দূরত্বও আছে
মেঘের মেয়ে অতো কাছে এসোনা কোন দিন
দিব্যি দিলাম মেঘের বাড়ীর, আকাশ কিংবা আলোর সারির”
আবার এই কবিই সমাজ সচেতন। তাঁর যন্ত্রণা কাতর কলম লিখেছে :-
(৩)“আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই,
আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য দেখি,
ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে-
এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দুঃস্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময়?”
তসলিমা নাসরিনের সাথে বিচ্ছেদ কি কবিকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল? অন্য নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েও মনের গভীর অতল থেকে তসলিমাকে কামনা করতেন? তাই শরীরে দুরারোগ্য রোগ বাসা বাঁধতে ডাক্তার যখন সিগারেট ছাড়ার পরামর্শ দিলেন, সোজা সাপটা বলেছিলেন, “সিগারেট ছাড়তে পারব না, ডাক্তারবাবু”। রুদ্র যেন মেতে উঠেছিলেন তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দেবার এক চোয়াল চাপা দৃঢ়তায়। বিরহ যন্ত্রণা? কবি থিতু হতে চেয়েছিলেন ভালবেসে? ভালবাসার সাথে সহাবস্থান বিচ্ছেদ নামের পলকা বাঁশের সাঁকোর। জানতে না কবি? তসলিমার সাথে বিচ্ছেদ বোধহয় সৃষ্টি করেছে শিশির ভেজা শিউলির মতো কান্না ভেজা কিছু অবিস্মরণীয় কবিতা।
৪) “চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে”।
তাই তো রয়েছ কবি। না থেকেও অগুনতি কবিতা প্রেমিকের অন্তর জুড়ে।
৫) “আমার ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে”
প্রেম, বিরহ, কবিতা আর রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ যেন বাঁধা পড়েছে চিরকালিন এক সমার্থক শব্দ বন্ধনীতে।

