উত্তরণ
ভূমিকা গোস্বামী
সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ট্যাবে মেল চেক করা – পৌলমী ব্যানার্জির অনেক দিনের অভ্যেস। গতকাল দশটার পর পাঁচটা মেল এসেছে। চারটেই ইনকাম ট্যাক্স, এল আই সি, পেনশন , হেল্থ ইনসিওরেন্স। রাত এগারোটা পঞ্চাশে শেষ মেল এসেছে বিদিশার।
লিখেছে- ম্যাম , আমি জলপাইগুড়ির স্থানীয় হসপিটালে পোস্টিং পেয়েছি। আপনার আর মাসির স্বপ্ন সার্থক করতে পেরেছি।পনেরো দিনের মধ্যে জয়েন করতে হবে। আপনার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবো না। সশ্রদ্ধ প্রণাম নেবেন। জানি , আপনার আশীর্বাদের হাত আমার মাথায় থাকবে চিরকাল। পড়তে পড়তে এ্যাডভোকেট পৌলমীর চোখে জল এসে গেল আনন্দে।
মনে পড়ে গেল, এর আগেও একবার এই আনন্দ পেয়েছিলেন তিনি। ছোটভাই পল্লব যখন পোস্ট ডক করতে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। ওর থেকে বারো বছরের ছোট পল্লব।
ওকালতি পাশ করে প্র্যাকটিসের শুরুতেই বাবার হঠাৎ হার্ট এ্যটাক। সুগার ছিল। কোন অনিয়ম কখনও করতেন না। খাওয়া দাওয়ায় যথেষ্ট সংযম ছিল। পছন্দের খাবারও সরিয়ে রাখতেন । বলতেন –আরো কিছুদিন বাঁচতে হবে বুঝলি ! পল্লবটা যে বড্ড ছোট। ওকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে তবে আমার ছুটি।
এখন ভাবে পৌলমী – বাবা কি জানতেন, তিনি আর বেশীদিন নেই ? মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে দায়িত্বের মাঝখানে, খেলা ফেলে চলে গেলেন বাবা। প্রাইভেট অফিসে উচ্চ পদে চাকরি করায় এককালীন বিশ লাখ টাকা মা পেয়েছিলেন। তার সুধ দিয়েই সংসার চলছিল। বছর পাঁচেক পরে এক বড় বিপর্যয় এল সংসারে। মায়ের লাংসে ক্যান্সার ধরা পড়ল। লাস্ট স্টেজ। পল্লব তখন মাত্র “আই সি এস ই ” দিয়েছে। মাত্র দুমাসের মধ্যে ই সব কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে মা চলে গেলেন।
নিজের কাজের পাশাপাশি পল্লবের পড়াশোনা, পল্লবের কেরিয়ারের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে বেলা গড়িয়ে গেছে…. ।
পল্লব এখন সংসারী হয়েছে। ও বিদেশে বিয়ে করে সেটেল্ড হয়েছে।। একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। বৌ ছেলের ছবি পাঠিয়েছে হোয়াটস আপে।
বিদিশা ডাক্তার হয়েছে। পৌলমী আজ সম্পূর্ণা।
সাত বছর আগের সেই প্রতিটি সময় , পল ,ক্ষণ চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সকালে পৌলমী ব্যানার্জির চেম্বারে, বিদিশাকে নিয়ে এসেছিল ওর আয়া মাসি। ভীরু ভীরু দুটি চোখ তাতে রাত্রি জাগরণের ছাপ। এলোমেলো চুল। ঠোঁটের কষে রক্ত শুকিয়ে আছে। জড়সড় হয়ে বসে ছিল আঠেরো বছরের অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটি ।
পুলিশের বড় বাবু ওদের পাঠিয়েছেন ওঁর কাছে।
প্রথমে কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারছিল না বিদিশা। মাথা নিচু করে বসে ছিল।
পরে অত্যন্ত আন্তরিক হয়ে স্নেহের স্বরে চেয়ার থেকে উঠে বললেন পৌলমী — তুমি তোমার সব কথা আমাকে খুলে বল মা। আমি কথা দিচ্ছি তুমি যথাযথ বিচার পাবে।
এইবার কান্নায় ভেঙে পড়েছিল ও। ধীরে ধীরে বলতে শুরু করেছিল ওর জীবনের গল্প।
ধনী পরিবারে জন্ম হয়েছিল ওর। বাবার ছিল পারিবারিক ব্যবসা। বাবা আর মা দুজনেই স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন করতো। অনেক রাতে বাড়ি ফিরতো। ও থাকতো আয়া মাসির কাছে। তিন বছর বয়স থেকে ওদের তুমুল ঝগড়া দেখে বড় হয়েছে। এক একদিন তো অনেক রাতে ওদের চেচামেচিতে ঘুম ভেঙে যেত। ভয়ে কাঁটা হয়ে আয়া মাসির কোলের মধ্যে কাঁপতো তখন ছোট্ট বিদিশা।
মাঝে মাঝে বাবা মা দামি দামি চকলেট আর খেলনাও আনতো ওর জন্য। আদরও করতো।কিন্তু কখনও ওকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেত না। ওর স্কুলের বন্ধুরা বাবা মায়ের সাথে কত দেশ বিদেশে বেড়াতে যেত। সেইসব ছবি দেখাত। ও তখন চুপ করে দেখতো ওদের খুশি আর আনন্দের ছবি। ও কখনোই বাবা মায়ের সাথে কাটানো কোন মূহুর্ত্তের ছবি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারতো না। কষ্ট হত। কিন্তু সে কথা বাবা মা কাউকেই বলে উঠতে পারে নি। আসলে , ওদের সাথে দেখাই খুব কম হত।
সকালে আয়া মাসি স্কুলের বাসে তুলে দিত। তখন বাবা মা ঘুমিয়ে থাকত। বাস থেকে নামিয়েও নিত মাসি। তখনও ওরা বাড়িতে থাকত না। বিকেলে সাজিয়ে গুজিয়ে পার্কে নিয়ে যেত আয়া মাসি। সন্ধেবেলা টিচার আসতো পড়তো । তারপর ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়তো।
এভাবেই একদিন আট বছরের জন্মদিন এল। আলো আর বেলুনে সাজল বাড়ি। বিশাল ড্রইংরুম ভরে উঠল লোকসমাগমে। কেক কাটা হল। খাওয়া দাওয়া হল। বক্সে গান চালিয়ে নাচ হল। সেই সময় মাসি ওকে ওর বেডরুমে এনে পোষাক বদলিয়ে শুইয়ে দিল। আর একটু থাকতে চেয়েছিল বিদিশা , কিন্তু পরের দিন স্কুল ছিল সেকথা মনে করিয়ে নিয়ে এসেছিল মাসি।
সেই রাতেই নাকি মা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল বিকাশ আঙ্কেলের সাথে। বাবা পরদিন সকালে ওকে বলল — মামন , তোমার মা আর এখানে থাকবেন না। আমিও এখন বেশ কিছু দিন বিদেশে থাকবো। এই বাড়িটাও কিছুদিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে যাবে। তাই তুমি চাইলে স্কুল হস্টেলে গিয়ে থাকতে পার। তোমার যা দরকার তুমি পেয়ে যাবে। তোমার এ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে বড় অংকের টাকা চলে আসবে।
আয়া মাসি বলল – যদি কিছু মনে না করেন ওকে আমি আমার বাড়িতে নিয়ে যাই? বাড়িতে আমার মা আছেন। আমি আর আমার মা মিলে দিব্যি ওর দেখাশোনা করতে পারবো। আমাদের অর্থের অভাব আছে ঠিকই, কিন্তু স্নেহের অভাব হবে না।
ওঁরা এরপর আর কোন খোঁজ নেয়নি বিদিশার। টাকা এসে যেত নিয়মিত। বাবা মা কোথায় থাকে জানত ই না। সেজন্য ওর কোন আক্ষেপ ও ছিল না। বাবা মায়ের অভাব বুঝতেই দিত না মাসি।
আয়া মাসির বাড়িতে আদরে যত্নে নির্ভয়ে বড় হচ্ছিল বিদিশা। আই সি এস ই পরীক্ষায় ভাল ফল করে ওই স্কুলেই ইলেভেনে ভর্তি হল সায়েন্স নিয়ে।
ইলেভেন টুয়েল্ভে সব সাজেক্টের প্রাইভেট টিচাররা ব্যাচ করে পড়ান তাই
সব সাবজেক্টের আলাদা আলাদা টিচারের কাছে সাইকেলে করে পড়তে যায় বিদিশা। মাসি এখন আর ওর সাথে সাথে যেতে পারে না । মাসি ওকে বলে- তোমাকে অনেক বড় হতে হবে। ডাক্তার হতে হবে। বড় ডাক্তার। অনেক মানুষের সেবা করবে তুমি।
ইলেভেনেও যথেষ্ট ভাল ফল করলো ও। টুয়েল্ভে ওঠার পর থেকে প্রাইভেট
পড়তে যাবার সময় কিছুদিন ধরে একটা ছেলে প্রতিদিন ওকে বিরক্ত করতো। ছেলেটা নিজেই বলেছিল – আমার নাম বুম্বা। কখনো একা, কখনো চার পাঁচটা বন্ধুদের নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো।ও জেনেছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী লোকের ছেলে নাকি বুম্বা।
দেখলেই নানা রকম বাজে বাজে কথা বলতো। নিজের সাইকেলটা ওর সাইকেলের সামনে নিয়ে থেমে যেত। এসব কথা মাসিকে বলেনি, মাসি এমনিতেই ওর জন্য ভীষণ চিন্তা করে। বললে হয়তো আরো চিন্তা করবে। ভেবেছিল পাত্তা না দিলে এমনি ই সরে যাবে।
বুধবার সন্ধ্যে সাতটায় বায়লজি পড়তে প্রফেসর মৌমিতা মুখার্জীর কাছে যাচ্ছিল। রাস্তায় একটা সাদা রংয়ের গাড়িতে ওরা ওকে জোর করে তুলল। অকথ্য অত্যাচার করে শেষরাতে ওকে আর ওর সাইকেলটাকে বাড়ির বাউন্ডারি গেটের কাছে ফেলে চলে গেল। অন্য দিন দশটায় ও বাড়ি ফেরে। সেইথেকে মাসি ঘর বার করছে। বৃষ্টি হচ্ছিল মুশলধারে। মৌমিতা মুখার্জী কে ফোন করে জেনেছে ও পড়তেই যায় নি আজ।এদিকে রাত বাড়ছে । কি করবে বুঝতে পারছিল না। দুশ্চিন্তায় ছটফট করছিল। হঠাৎ গাড়ির থামার শব্দে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে প্রায় অচেতন বিদিশাকে দেখল। ওকে তুলে ঘরে এনেই একশো নম্বরে ফোন করেছিল মাসি। পুলিশ সকালে লালবাজারে আসতে বলেছিল।
খুব কাঁদছিল বিদিশা। বারবার বলছিল — এই লজ্জা নিয়ে আমি বাঁচতে চাই না। মাসি ওকে দৃঢ়তার সাথে বলেছে- এ লজ্জা তোর নয়। যারা তোকে কষ্ট দিয়েছে লজ্জা সেই জানোয়ারদের মরবে ওরা। আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।
পুলিশের বড় বাবু সব কথা শুনে , পৌলমী ব্যানার্জী কে ফোন করে এ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিলেন। তারপর থেকে যা যা করার ,সব দায়িত্ব নিয়ে পৌলমী ব্যানার্জী করেছেন।
মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট হাতে পেয়েই পুলিশ এ্যারেস্ট করেছিল বুম্বাকে। তারপর ওর তিন বন্ধুকেও।
সামনে আই এস ই। মানসিক বিপর্যস্ত বিদিশা পরীক্ষায় বসতেই পারল না সেইবার। পৌলমী ওকে মানসিক বল দিয়েছে। পাশাপাশি ভাল কোচিং এর ব্যবস্থা ।
পরের বছর অত্যন্ত ভাল ফল করল ও। আই এস ই তে আর জয়েন্টেও। মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগও পেল।
এরমধ্যে বুম্বা সহ তিন বন্ধুর দশ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে। পৌলমী ব্যানার্জীকে বুম্বার বাবা এই কেস থেকে সরে আসার জন্য টাকা অফার করতে এসেছিল । ওঁর বাড়ির সি সি ক্যামেরায় সেই ছবি আদালতে পেশ করায় কেসটা আরও মজবুত হয়েছে। তাই বেশী সময় লাগে নি সল্ভ হতে ।
এতক্ষণ যেন কোন টাইমেশিনের মন্ত্রে সাত সাতটা বছর আগের রাস্তাঘাট, মানুষ , ছোট বড় ঘটনার সঙ্গেই মিশে ছিলেন পৌলমী। বাড়ির কাজের মেয়েটার ডাকে সম্বিত ফিরল ওঁর।
-কি হল দিদা! ব্রেকফাস্ট করবে না ? দশটা বাজতে চলল তো !
- যাচ্ছি রে, এক্ষুনি যাচ্ছি।
তাইতো ! মেলটা তো শেষ পর্যন্ত পড়াও হয়নি।
মেলের শেষে বিদিশা লিখেছে। - দিদা গতমাসে মারা গেছেন। মাসি একা হয়ে গেছে। এ কদিনে মাসির বাড়ির একটা ব্যবস্থা করে মাসিকে আমার সাথেই নিয়ে যাব। ওখানে ফ্যামিলি কোয়ার্টারও দিয়েছে। আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে ম্যাম। না বললে শুনবো না। নিজের খেয়াল রাখবেন। প্রণামান্তে বিদিশা।


সত্যিই উত্তরণ। এই ধরণের পজিটিভ লেখা মনের জোর বাড়ায়। খুব ভাল।
খুব সুন্দর গল্প । খুব ভালো লাগলো ।
বেশ সুন্দর ছোটগল্প লেখার হাত থেকে আরও লেখার আশা করি।
সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ।