ফিচারঃ সরকার এবং সৃজনশীল : চাই সুনির্দিষ্ট দূরত্ব-অনিরুদ্ধ সুব্রত

যে কোনো সরকারের উচিত, শিল্প সাহিত্যের সৃজনক্রিয়া থেকে প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখা শুধু রাষ্ট্রীয় লাভ নয়, তাতে সৃজনক্রিয়ারও লাভ।

প্রাচীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ছিল না, অধিকাংশ ক্ষেত্র ছিল একনায়ক এবং সোজাসুজি স্বৈরাচারী, ফলে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো ছিল একা রাজার। এবং সেখানে সৃজন মানেই ছিল— রাষ্ট্রনায়কের নামে কেত্তন গাওয়া ; অতিরিক্ত হলে খুব জোর আদিরসাত্মক কিছু বিনোদন রচনা।

আধুনিক এবং উত্তরাধুনিক কালে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা মোটামুটি গণতান্ত্রিক রীতির। ফলে, এখানে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং সৃজনশীলতার অল্পবিস্তর জায়গা আছে। আর এই সুবর্ণ সুযোগটুকু আছে বলেই, ধারাবাহিক ভাবে একটি আলাদা ধরণের লাভজনক-সৃজনশীল শ্রেণি তৈরি হয়েছে।

পৃথিবীতে ইতিহাস লেখার বোধ যখন থেকে তৈরি হলো রাজাদের, ঠিক তখন থেকেই সম্ভবত এই বিশেষ শ্রেণির রাজকীয়-সৃজনীদের দেখা মিলতে শুরু করল সভ্যতায়। তাই পুরাতন ইতিহাস আর রাজ অনুদানপুষ্ট সাহিত্য—মোটামুটি দুটি নিকট প্রোডাক্ট।

আমাদের দেশ পৃথিবীর বাইরে নয়, আর আমাদের রাজ্য এই দেশটিরও বাইরে নয়। এদেশের প্রমাণ সাপেক্ষ ইতিহাসের লিখিত রূপের মধ্যেই বহু প্রকার তরল মিশ্রিত। সব তরল হয়তো জল নয়। যাই হোক শুরুতে ভাবিইনি এটা ইতিহাস বিষয়ক কথাবার্তার আলোচনা হবে। সুতরাং মূল কথায় আসা যাক। এ লেখার লক্ষ্য ছিল, শিল্প সাহিত্য।

অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তন হয়েছে ; স্বাভাবিক ভাবেই আশা থাকে যে পুরাতন সরকারের সঙ্গে সঙ্গে কিছু বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর বিষয়েরও পরিবর্তন হবে। সমাজে চুরি, ছ্যাচড়ামির যেমন পরিবর্তন হবে আশা করি, তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে চাকরি সব ক্ষেত্রেই যোগ্যতমের উদবর্তন হবে— এমনই আশা করি। তা না হলে কীসের পরিবর্তন !

আর ঠিক সেই যুক্তির পথে খুব সোজাসুজি বলতে চাই যে, রাজক্ষমতার পাশে পোষ্যের মতো পড়ে থাকা সাহিত্যিক বা শিল্পীদের আর যেন দেখতে না হয়। পূর্বেও ছিল কিছুটা রাখঢাক করে। কিন্তু শেষ দেড় দশকে, কবিতা লিখিয়ে থেকে চিত্র আঁকিয়ে এবং সংগীত গায়ক থেকে নাট্য বা সিনেমার কুশীলবগণ—- এমন নির্লজ্জভাবে জড়াজড়ি করে ছিলেন সরকারের সঙ্গে, যা দেখে গা ঘিনঘিন করেছে সমগ্র বাঙালি জাতির।

রাজনৈতিক পরিবর্তনে সরকার নতুন হয়, সাধারণ মানুষের নতুন বায়নাও কিছু থাকে। এটা কিন্তু বায়না নয়, সৃজনশীল কাজের সম্মান রক্ষা।

সংস্কৃতি মন্ত্রক আছে, সাহিত্য শিল্প নাট্য প্রভৃতি একাডেমি আছে, আছে কিছু পুরস্কার, অনুষ্ঠান এবং কতগুলো ভবন। এর প্রতিটিই বাঙালির প্রকৃত অস্মিতা বহন ও প্রকাশ করে। কিন্তু শেষ দেড়দশকে তার অপব্যবহার, অতিব্যবহার, অসদব্যবহার বড়ই পীড়িত করেছে সারা বাংলাকে। যা একেবারেই অনভিপ্রেত ছিল ।

রাষ্ট্র ক্ষমতা চিরকালই দীর্ঘকালের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে দখল করে তার নিজস্ব ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ খোঁজে। এবং তার বিপরীতে শিল্পী, কবি, লেখক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক প্রমুখ সৃজনশীল ব্যক্তি স্বকীতার জন্য নীরব সংগ্রাম করে— এটাই পরিচিত ও মান্য সত্য।
রাষ্ট্র অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত ভাবে সুষ্ঠু সৃজনশীল কাজের সার্বিক সহযোগিতা করবে, এটা অতি আবশ্যিক। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতা, সৃজনশীল ব্যক্তিবর্গ-কে মোটা আর্থিক মাসোহারা দিয়ে, পুরস্কার দিয়ে, বিভিন্ন কমিটির অস্থায়ী পদস্থ করে পুষবে,—- তা কখনোই নৈতিক বা কাম্য নয়। এমনকি সামগ্রিক ভাবে উন্নততর সৃজনশীল কাজ তাতে দিন দিন অধঃপতনে পর্যবসিত হয়।

আবার রাষ্ট্র এইভাবে এক শ্রেণির পদোদক-পায়ী গুণকীর্ত্তনকারী গড়ে তোলে, যারা বিনিময়ে সমাজের সর্বত্র স্বৈরাচারীর পক্ষে মিথ্যা ভাষণ দিয়ে বৃহত্তর জনমত তৈরির আবহ সৃজন করে। বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এইরূপ সংস্কৃতি-শ্রেণি আসলে একটা জাতির প্রকৃত, প্রকৃষ্ট ও একক যোগ্যতম সৃজনশীল ব্যক্তিকে উপেক্ষা ও অবহেলা করে যায় ধারাবাহিক ভাবে। যা বৃহত্তর জাতির পক্ষে চরম ক্ষতিকর।

মোটকথা শেষ দেড়দশকের এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি আপামর বাঙালি আর চায় না। এ কথা নতুন সরকারকে বুঝতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বরং সাংস্কৃতিক সৃজন কাজে যুক্তদের থেকে সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে, শিল্প-সংস্কৃতির স্বাধীনতা কায়েম রাখা একান্ত দরকার।

পাশাপাশি সুবিবেচনা দিয়ে, উপযুক্ত মর্যাদা সহ প্রকৃষ্ট সৃজনশীলদের উৎসাহিত করতে সততার সঙ্গে উপযুক্ত পুরস্কারেরও প্রয়োজন ।
কিন্তু কোনো ভাবেই রাজা যেন তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে এবং একছত্র হয়ে উঠতে সমাজের সৃজনশীল অংশের সঙ্গে মাখামাখি প্রেমে মেতে না ওঠেন। তার খেয়াল রাখা দরকার প্রথম থেকেই।

তাতে সৃজন যেমন ধ্বংস হবে, রাজাও তেমনি পরিত্যক্ত হবেনা অচিরেই। নষ্ট হবে বাঙালির চিরন্তন অস্মিতা। পশ্চিমবঙ্গের নব নির্বাচিত সরকার আশা করব পূর্বতন ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকবেন—- তা না হলে এই লেখাটি একেবারেই বৃথা।

One thought on “ফিচারঃ সরকার এবং সৃজনশীল : চাই সুনির্দিষ্ট দূরত্ব-অনিরুদ্ধ সুব্রত

  1. খুব প্রাসঙ্গিক এবং প্রনিধান যোগ্য লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *