মুক্তগদ্যঃ যে কাহিনী লিখে রাখার প্রয়াস করি- রাধাকৃষ্ণ গোস্বামী(রাধু)

মায়া, ফিরে আয়, মায়া তীরে আয়,
কোনটা বলব?
যদি আমি বিশাল পারাপারহীন সমুদ্র পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকি তাহলে হয়তো আমার বলা উচিৎ হবে – মায়া তীরে আয় বা মায়া ফিরে আয়।
মায়া ! সে তো অশরীরী আজ । অন্তত আমার কাছে। তবু কেন যেন মনে পড়ে এইতো সেদিনের কথা আর তাতো ভুলে যাবার নয়।
ছোট্ট একটা ছেলে পরণে তাঁর ইজের লম্বা একটা দড়ি ঝুলছে, খালি গা সেই বিকেল থেকে দাঁড়িয়ে আছে একা মঠের মাঠের ধারে। তার চোখে মুখে চিন্তার ভাঁজ, তাহলে আজ কি কাকু আসবে না? তবু আরও এক দু মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা উচিত। কাকু যদি এসেই পড়ে আর ওকে অন্যান্য বারের মত দেখতে না পায়, তাহলে কাকুর দুঃখ হবেনা? এক সময় ছেলেটির কাকু সত্যিই এসে পড়ল। তিনি ছেলেটিকে দূর থেকেই দেখতে পেলেন আর তাঁর বয়ে আনা ছোট একটা প্যাকেট লুকিয়ে ফেললেন। এদিকে সেই ছোট্ট ছেলেটিও কাকুর একটা হাত ধরে অন্য হাতটা ধরতে চেষ্টা করতে লাগলো। দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ খেলা চলল। পেছন থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়েই ছেলেটির বাবা মৃদু ধমক দিয়ে বললেন – থাম সুমন, ছেলেটা কত দূর থেকে এসেছে, ট্রেন নৌকা করে ! ওকে আগে ঘরে আসতে দে।”
এবার আর সুমনের দেরী করতে হলো না। ওর কাকুর হাতের লুকোনো প্যাকেটটা সুমনের হাতেই এসে গেছে। সে সেটা না খুলেই নিয়ে চললো তার মায়ের কাছে। মা সেটা খুলে সকলকে দেখাবে ঐ প্যাকেটটায় ছিল একটা বড় চকোলেট আর এক জোড়া হাফ প্যান্ট সুমনের জন্য।

দূরের জিনিসটা এত কাছে চলে এল ? মায়া কি উবে গেল? নাঃ, মায়া যেন আরেকটা দৃশ্য সামনে আনল।
সাদা খোলের লাল পাড় শাড়ি পরে ষোড়শী চলেছে তার কল কল্লোলিনী এক ঝাঁক সঙ্গীদের সঙ্গে। তাঁকে কি ডাকবো আমি পেছন থেকে? তাঁকে কি আমি পেতে চাইবো নিজের করে?
নাঃ। সেটা তাঁর পছন্দের তালিকায় নাও থাকতে পারে। সমাজ সংসার আছে তাঁর আর আমারও।
ওঁর ঘন কালো চুলের বেশ বড়সড় বিনুনির দুলুনি যেন হাতছানি দেয় আমায় বারবার অনেক বার।
কিন্তু আজ যে আমি নিরুপায় ! সে ক্রমশঃ অপসৃয়মানা। বিশাল তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের ধারে আমি দেখছি মিলিয়ে যাচ্ছে সে আমার দৃষ্টির আড়ালে। আমার ডাক তাঁর কাছে যাচ্ছে না। তাই তো আমি ডাকতে চাই – মায়া, তীরে আয় ফিরে আয়। “
সেকি আসবে ! – হয়তো আসবে।

নাঃ,‌ সেতো এখনি এলোনা। এইতো আমি ফিরে ফিরে তাকাই আর দেখি, সঙ্গে ধূতি পাঞ্জাবি পরা কবি গোবিন্দ ভট্টাচার্য থাকতেন, লোকটা আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে যেমন সমুদ্রের বালির উপর নানান ধরনের ও নানান সব মূর্তি আঁকতো‌ এখনও ‘স্যান্ড মিউজিয়ামের ঘেরাটোপে বসে সে‌রকম হাজারো ছবি এঁকে চলেছে নিজের মনে একান্ত আপন তালে। কী অপূর্ব সব ভাবনা!
হয়তো সে আবার বার বার ফিরে আসবে।

পাঠকের ইচ্ছে থাকলে হয়তো মায়া আবার ফিরে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *