এক শো বছর আগে কেমন ছিল মল্লরাজ্য বিষ্ণুপুর
মধুসূদন দরিপা
বিষ্ণুপুর আছে বিষ্ণুপুরেই। বিগত একশো বছরে সুপ্রাচীন এই ‘ দ্বিতীয় দিল্লী ‘ শহরের শরীরে বাড়ি ঘর, অফিস আদালত, দোকানপাট, ইশকুল কলেজ, লজ হোটেল ইত্যাদি ক্ষেত্রে তথাকথিত কিছু আধুনিক বিন্যাস পরিলক্ষিত হলেও আদতে তার নাড়ি টিপলে সেই সাবেক ‘ বন-বিষ্ণুপুর ‘ অধিকাংশে আজও অপরিবর্তিতই আছে।
আজ থেকে ঠিক এক শো বছর আগে রামানুজ কর ও ফকিরদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ১৩৩২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ‘ বাঁকুড়া জেলার বিবরণ ‘ গ্রন্থে বিষ্ণুপুর প্রসঙ্গে ‘ সহরের অবস্থা ‘ শিরোনামে উল্লেখ করেছেন :
বিষ্ণুপুর সহরটি বৌলতলার বাজার, কাদাকুলী, গড়দরজা, শাঁখারীবাজার, শ্যামরায়ের বাজার, কৃষ্ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ প্রভৃতি বহুসংখ্যক পল্লীতে বিভক্ত। কৃষ্ণগঞ্জে সপ্তাহে দুইদিন হাট হয়, সম্প্রতি মিউনিসিপ্যালিটি হইতে পোকাবাঁধের নিকট একটী নূতন বাজার প্রস্তুত হইয়াছে, বৌলতলা বাজারেও মিউনিসিপ্যালিটির একটী বাজার আছে। বিষ্ণুপুরে জীবনযাত্রা নির্ব্বাহোপযোগী সকল দ্রব্যই সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। নানাস্থান ও জঙ্গলমধ্যস্থ সাঁওতাল গণের নিকট হইতে সহরে বিস্তর দ্রব্যাদি আমদানী হইয়া থাকে। বেঙ্গলনাগপুর রেলওয়ে বিষ্ণুপুরের এক মাইল দক্ষিণদিক দিয়া গমন করিয়াছে। বিষ্ণুপুরে একটী রেলওয়ে স্টেশন আছে। ইহা বাঁকুড়া জেলার একটী সবডিবিজান বা মহকুমা। এখানে ফৌজদারী ও দেওয়ানী দুইটী আদালত, মিউনিসিপ্যাল অফিস, সবরেজিস্টরি অফিস, দাতব্য চিকিৎসালয়, পোষ্টাফিস, এন্ট্রান্স স্কুল, গুরুট্রেণিং স্কুল ও একটী সঙ্গীত বিদ্যালয় আছে।
বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে। মল্লেশ্বর পল্লীতে দু’ শো টাকায় তদানীন্তন ভূস্বামী ভোলানাথ ভট্টাচার্যের কাছ থেকে খরিদা এক বিঘা তের কাঠা জমির উপর। স্থানটির যথাযথ অবস্থান ছিল বিষ্ণুপুর থানার পূর্বদিকে ও পোকাবাঁধের পশ্চিমদিকে এবং চকবাজারের নিকটবর্তী ধোপাবস্তির দক্ষিণদিকে। আরো স্পষ্টভাবে বর্তমানে যেখানে রাঠীমন্দির অবস্থিত সেখানে। ছাত্রাবাসও ছিল। বিদ্যালয়গৃহ ও ছাত্রাবাস ছিল মাটির দেওয়াল ও খড়ের ছাউনিযুক্ত। ছাত্রাবাসে বারো তেরো জন ছাত্র রাখার ব্যবস্থা ছিল। থানার কুয়োর জল পানীয় জল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৮৮৬ সালে অগ্নিকাণ্ডজনিত কারণে ও ১৯৮২ সালে জলঝড়ের প্রচণ্ড তাণ্ডবের আঘাতে বিদ্যালয়গৃহ নিদারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯০৭-০৮ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যালয়গৃহ নূতন করে নির্মাণের উদ্যোগ গৃহীত হলে পরিচালন সভার সভাপতি ও বিষ্ণুপুরের তৎকালীন মহকুমা শাসক রাখালমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিদর্শক এম. প্রথেমো, সম্পাদক গোরাচাঁদ গোস্বামী ও অন্যান্য স্থানীয় বিদ্যানুরাগীদের আবেদনে সাড়া দিয়ে শিবদাস ভট্টাচার্যের ভ্রাতুষ্পুত্র রামদীন ভট্টাচাৰ্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লালবাঁধের নিকটবর্তী হামারবাড়ী পল্লীতে বিরানব্বই বিঘা জমি দান করেন। তাঁর দানকৃত জমিতে নির্মিত হয় দশ কক্ষবিশিষ্ট পাকা বিদ্যালয়গৃহ। এটাই লো বিদ্যালয়ের মূল ভবন। পরবর্তীতে আরো সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমান আকার ধারণ করে। ১৯২১-৪৫ পর্বে গড় হাজিরা ছাত্র সংখ্যা ছিল ৪৩৯ জন। প্রধান শিক্ষক ৪০-৫০ টাকা ও সহকারী শিক্ষক ১৫-২০ টাকা বেতন পেতেন। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীরা পেতোন ১০ টাকা। ১৯০৬-৩৫ প্রধান শিক্ষক ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত। পরিচালন সমিতির সভাপতি পদ সেই সময় বিষ্ণুপুর মহকুমা শাসকরাই অলঙ্কৃত করতেন। প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় এই পদে আসীন ছিলেন তিরিশের দশকের শেষ ও চল্লিশের দশকের গোড়ায়।
১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে বিষ্ণুপুর পৌরসভার পত্তন হয়েছিল। মল্লরাজাদের তৈরি সাতটি বাঁধ যথা কৃষ্ণ, যমুনা, কালিন্দী, শ্যাম, লাল, পোকা ও গাঁতাই নামে অভিহিত। পৌরসভা কর্তৃক এইসব জলাশয়গুলির পরিচর্যার মান যে কেমন ছিল, তার বর্ণনা আমরা পাই ফকিরদাস চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় : :
ঐসকল জলাশয়ের জল অতি উৎকৃষ্ট, বিশেষতঃ পোকা বাঁধ ও লালবাঁধের ন্যায় উৎকৃষ্ট পানীয় জল কুত্রাপি দৃষ্ট হয় না। এখানকার লোকেরা কলসীর মুখে ৩/৪ পর্দা বস্ত্র দিয়া ঐ জল ছাঁকিয়া লয় ও পানার্থ ব্যবহার করে। ইহার জলের পরিপাকশক্তির বিষয় শুনিলে আশ্চর্য্যান্বিত হইতে হয়। আকণ্ঠ ভোজনের পর ইহার অতি অল্প পরিমাণ জল পান করিলেও অত্যল্প সময়ের মধ্যে ভুক্তদ্রব্যসকল পরিপাক হইয়া যায়।
মল্লরাজাদের আমল থেকে লালিত বিষ্ণুপুর ঘরানার সংগীত চর্চা একশো বছর আগেও এই শহরে সমান তালে বহাল ছিল। কলকাতায় মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের বাড়ীতে গান শেখাতেন বিষ্ণুপুরের পণ্ডিত নীলমাধব চক্রবর্তী। সেসময় রাজপুত্র আলবার্ট ভিক্টর কলকাতায় আগমন করলে শ্রীচক্রবর্তী তাঁকে ‘ কানুন ‘ নামে একটি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অভিবাদন করে মোহিত করেছিলেন। এছাড়াও বিপিনবিহারী দেঘরিয়া, রাধিকাপ্রসন্ন গোস্বামী প্রমুখ সংগীতাচার্য কলকাতায় সংগীত শিক্ষা দিতেন। নাড়াজোল রাজবাড়ী ও বর্ধমান রাজবাড়ীতে বহাল ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার দুই দিকপাল সংগীতাচার্য যথাক্রমে রামপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় ও গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেসময় এই শহরে বসে সংগীত শিক্ষা দিতেন কীর্ত্তিচাঁদ গোস্বামী ও হারাধন দেঘরিয়া। পণ্ডিত রামশরণ মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের উদ্যোগে বিষ্ণুপুর শহরে ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে গড়ে ওঠে রামশরণ কলেজ অফ মিউজিক।
১৯২১ সালে বিষ্ণুপুর থানায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, তাম্বুলী, তাঁতী, নাপিত, তিলি, সদগোপ, গন। ধবণিক, কামার, লোহার, কুলু, গোয়ালা, বাগ্দী, বৈষ্ণব, বাউরী, ডোম প্রভৃতি মোট ২৬ টি জাতির ৩৫৪৪৭ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ বসবাস করতেন। মুসলমান ছিলেন ২৪৭৬ জন। খ্রিস্টান ছিলেন ৩১ জন। হিন্দুদের সবচেয়ে বড়ো উৎসব ছিল দুর্গাপূজা এবং মুসলমানদের ছিল ইদ। এসম্পর্কে বিষ্ণুপুরে আজ থেকে ১০০ বছর আগে ফকিরদাস চট্টোপাধ্যায় লিখিত বর্ণনায় পাওয়া যায় :
যেমন মদনমোহন জীউ মল্লভূমের রাজবংশের কুলদেবতা, তেমনি মৃন্ময়ী মাতাও উক্ত বংশের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে আজিও বিষ্ণুপুরে বিরাজমানা আছেন। ইনি দশভূজা রূপধারিণী। প্রত্যহই ইঁহার পূজা হইয়া থাকে। শরৎকাল সমাগত হইলে কৃশ্ণপক্ষীয় নবমী তিথিতে ইঁহার নবম্যাদি কল্প আরম্ভ হয়। এইদিন হইতে প্রত্যহ বৈকালে ৺মাতার পূজার দালানের সম্মুখে দরবার হইয়া থাকে। সহরের বৃদ্ধা বেশ্যারা ঐ দরবারে উপস্থিত হইয়া বিশুদ্ধ তান-মান-লয় সহযোগে সংগীতাদি আলাপ করিয়া থাকে। যুবতী বেশ্যাদের দরবারে উপস্থিত হইবার রীতি নাই। রাজা ও রাজপারিষদগণ দরবারে উপস্থিত হইয়া সংগীতাদি শ্রবণ করিয়া থাকেন। বেশ্যাদের জন্য ষোল বিঘা নিষ্কর জমি প্রদত্ত হইয়াছে। তাহারা বিনা করে রাজধানীতে বাস করিতে পারিবে, এইরূপ বন্দোবস্ত প্রাচীন কাল হইতে প্রচলিত আছে।
প্রায় সাত বৎসর অতীত হইল, ৺মৃন্ময়ী মাতা ৭০০ সাত শত বৎসর পরে নব কলেবর ধারণ করিয়াছেন। মল্লবংশীয় রাজারা পরমধার্ম্মিক ও নিষ্ঠাবান হিন্দু ছিলেন। পৃরবাদ এই যে, দেবদেবীরা তাঁহাদের নিকট প্রত্যক্ষভাবে আবির্ভূত হইতেন। দুর্গোৎসবের মহাষ্টমীর দিন সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হইলে রাজাবাহাদুর দেবীর আগমধসূচক কোলাহল শুনিতে পান এবং তিনি “ শুভং “ এই শব্দ উচ্চারণ করিবামাত্র দুর্গপ্রাচীরস্থিত একটী ব্যাঘ্রমুখবিশিষ্ট প্রকান্ড কামানে অগ্নি সংযোগ করা হইয়া থাকে, ঐ কামানের শব্দে দিগদিগন্ত প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠে এবং ঐ শব্দ শ্রবণ করিয়া সমস্ত মল্লভূমবাসী প্রজাগণ সন্ধিক্ষণ সমাগত জানিয়া দেবীর নিকট বলি প্রদন করিয়া থাকে। গতবৎসর কামান ফাটিয়া গিয়া এক ব্যক্তির মৃত্যু হইয়াছে। যাহারা সন্ধিক্ষণের সময় পুরুষানুক্রমে অগ্নিসংযোগ করিয়া আসিতেছে, তাহাদের জন্য ভূতপূর্ব রাজারা নিষ্কর জমি দান করিয়া গিয়াছেন।
আজ থেকে ১০০ বছর আগে বিষ্ণুপুর থানায় আড়াই হাজার সাঁওতাল বাস করতেন। ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের ইন্দ্র দ্বাদশীতে তারা ইদ উৎসব পালন করতেন বিষ্ণুপুর ও তার সন্নিকটস্থ জঙ্গলে বাসকারী সাঁওতাল পরিবারের নারী পুরুষ শহরে উপস্থিত হতেন। একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঢেঁকির মতো একটি কাঠ নামানো থাকতো। পুরুষের দল মাদল বাজাতো ও নারীরা পরস্পর কোমর ধরে বৃত্তাকারে নাচতে নাচতে পথ পরিক্রমা করতো। তারা মাথায় ফুল, ময়ূরপালক, গাছের বাহারি পাতা ইত্যাদি সাজে সজ্জিত হয়ে নাচ ও গানে মেতে উঠতেন। রাজা হাতির পিঠে চেপে উপস্থিত হলে সেই কাষ্ঠখণ্ডটি উপরে তুলে পুনরায় মাটিতে ফেলে সমবেত কণ্ঠে জয়ধ্বনি করে উঠতো। সন্ধ্যার পর সকলে বাড়ি ফিরে যেত। এই ইদপরব উপলক্ষে শহরে মেলা বসতো ঐ একদিনের জন্য।
বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী জঙ্গলে তসর চাষ হতো। শহরের তাঁতীরা চাদর, ধুতি, শাড়ি তৈরি করতেন। সোনামুখী থেকে রেশমসুতো আসতো। বিষ্ণুপুরে বালুচরী শাড়ি তৈরি হতো। যে ধারা আজও চলছে। এছাড়া বিষ্ণুপুরের অম্বুরী তামাক প্রস্তুত হতো। শ্রীহেমচন্দ্র কর এই ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। তিনি কাঁসা ও পিতলের বাসন ব্যবসাও করতেন। আরও যারা যুক্ত ছিলেন তারা হলেন রাধিকাপ্রসাদ ও কৃষ্ণপদ দালাল, রামসদয় বায়েন, প্রহ্লাদচন্দ্র কাইতি, অখিলচন্দ্র কাইতি, রজনীকান্ত কুচল্যান, বিশ্বেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, অক্ষয়চন্দ্র দত্ত, পূর্ণচন্দ্র চৌধুরী, রাধাবল্লভ সেন, অদ্বৈতচরণ দাস, রামনলিনী চক্রবর্তী, চারুচন্দ্র চৌধুরী, কেশবচন্দ্র চৌধুরী, শরচ্চন্দ্র চৌধুরী। বিশ্বেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তসর, গরদ, পাট ও শাঁখা ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন। তিনি মল্লভূম শিল্পসমিতির পদাধিকারী ছিলেন। সুতাকলের মালিক ছিলেন হরিদাস ও শিবদাস রাঠী। বালমুকুন্দ কিষণগোপালের ধানকল ছিল। ভিন রাজ্য থেকে মশলা আমদানি করতেন বৈকুণ্ঠ নাগ কর, কালীপদ সেন, যোগেন্দ্রনাথ কুণ্ডু, যজ্ঞেশ্বর দাঁ, জহরীলাল পালীরাম, ঘনশ্যামদাস দেড়রাজ প্রমুখ। বিহার, যুক্তপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ থেকে ডাল আমদানি হতো। গান্টুর থেকে ঘি আমদানি করা হতো। মাদ্রাজের আনাকাপালী থেকে বাদামতেল মেশানো ঘি আসতো। পাঞ্জাব, গোয়ালপুর, দিল্লী, কানপুর থেকে ময়দা আমদানি হতো। জিরা আসতো আগ্রা থেকে। গুড় আসতো বিহার ও মান্দ্রাজ থেকে।
গানবাজনা মতিচুর
এই নিয়ে বিষ্ণুপুর।
মিষ্টান্ন ব্যবসায়ে প্রসিদ্ধ ছিল বিষ্ণুপুর। মিঠাই তৈরির কারিগর ছিল অনেক। পোকাবাঁধ পাড়ে সৃষ্টি দের পানতুয়া ও ঘি আজও প্রসিদ্ধ। সেসময় বিষ্ণুপুর শহরের লাইফলাইন রাস্তা ছিল বোলতলা পোকাবাঁধ হয়ে কাটানধার। বাস দাঁড়াতো পোকাবাঁধে। তিনচাকা রিকশা ছিল অন্যতম বাহন। মানুষ সাইকেল ব্যবহার করতো বেশি।
বাঁকুড়া দর্পণ সাময়িক পত্র প্রথম প্রকাশিত হয় ১ লা ফেব্রুয়ারী, ১৮৯২ সালে। সম্পাদক ছিলেন রামনাথ মুখোপাধ্যায়। পরবর্তী কালে সেটি যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেন রামরবি মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। একশো বছর আগে এই সাময়িক পত্রে প্রকাশিত বিষ্ণুপুর অঞ্চলের একটি ব্যতিক্রমী সংবাদের উল্লেখ করে এই নিবন্ধের পরিসমাপ্তি করবো।
সংবাদদাতার পত্র
বিষ্ণুপুর : ২২/১/১৯২৩
জালি নোট বিক্রয় : বিষ্ণুপুর থানার অন্তর্গত (?) গ্রাম নিবাসী অদ্বৈতচরণ বসু দুইজন কাবুলীর নামে স্থানীয় পুলিশে এই অভিযোগ আনে যে দুইজন কাবুলী একত্রে আসিয়া প্রকৃত নোটের আকারে একখানি কাগজ (?) মহারাজের নোট বলিয়া এক বৎসর পরে ৫০০০ টাকা তাহার বিনিময়ে পাওয়া যাইবে এই প্রলোভনে ভুলাইয়া ২৯ টাকা মূল্য ঠিক করিয়া কুড়ি টাকার পরিবর্তে নগদ ১০ টাকা একটি সোনার অঙ্গুরী লইয়া তাহা বিক্রয় করে। উক্ত কাগজে নানা ভাষায় ৫০০০ অঙ্ক মাত্র লেখা আছে। প্রতিজ্ঞায় টাকার পরিবর্তে ইংরাজী অক্ষরে ৫০০০ গ্রিটিংস বা বকশিস ধন্যবাদ বলিয়া উল্লেখ আছে। উক্ত দুইজন কাবুলী পুলিশ কর্তৃক ধৃত হইলে সোনার অঙ্গুরীটী ও ২০ টাকা ফিরাইয়া দেয় এবং পুলিশ কর্তৃক চালান হইয়া হাজতে থাকে। আমাদের সুযোগ্য সবডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মৌলবী মামুদ সাহেবের হস্তে বিচারের ভার অর্পিত হয়। কয়েকজন উকিল ও মোক্তার আসামী পক্ষ সমর্থন করেন। কোর্ট সবইন্সপেক্টার বাবুর অকালমৃত্যুতে থানার সিনিয়র সবইন্সপেক্টার (?) পক্ষে মোকদ্দমা চালাইতেছেন। একজন কাবুলীর উক্ত কার্যে হস্তক্ষেপের কোন প্রমাণ না থাকায় সে খালাস পায়। অপরের বিরুদ্ধে (?) ২০ ধারায় চার্জ গঠিত হয়। সশ্রম কারাদণৃড ও ২০ টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ হয়। উক্ত আসামী কাবুলী জবাবে করুণ স্বরে কহে যথাসর্বস্ব আমার খরিদ করিয়া উক্ত (?) বলিয়া স্বীকার করিয়াছিল।
সহায়ক গ্রন্থ :
১. বাঁকুড়া জেলার বিবরণ : রামানুজ কর ও ফকিরদাস চট্টোপাধ্যায়
২. বাঁকুড়া দর্পণ : সম্পাদনা : আবীরলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও শেখর ভৌমিক
৩. বাঁকুড়ায় ব্রিটিশ শাসন : সুদীপ্ত পোড়েল
৪.বৃটিশ রাজত্বে বাঁকুড়ার সাধারণ মানুষ
৫. নয়া বাঁকুড়ার গোড়াপত্তন ও বিকাশ : রথীন্দ্রমোহন চৌধুরী
৬. ইংরাজ আমলে বাঁকুড়া জেলার আদালত : তন্ময় কর
৭. অতীত বাঁকুড়ার আর্থচিত্র : রথীন্দ্রমোহন চৌধুরী
৮. শেষ মধ্যযুগে বাঁকুড়া জেলার রাজনৈতিক-সামাজিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক ইতিহাস: প্রভাতকুমার সাহা
৯. ব্রিটিশ রাজপর্বে বাঁকুড়া জীবন : রথীন্দ্রমোড়ন চৌধুরী

