মুক্তগদ্যঃ যা কিছু জাতি নীরবে জানে- নীলম সামন্ত

যুগ যুগ ধরে দ্রোহ আমাদের রন্ধ্রে। যখনই রাষ্ট্র খড় চাপা খড়ের মতো পচতে থাকে, দুর্গা ছাতু মাথা তোলে৷ দোঁয়াশ মাটি হিউমাস চেনে। পচা গলা মৃতদেহের ওপর ভূ-কীটের অবাধ বিচরণ, খেয়ে ফেলার স্বভাব জমিকে উর্বর করে কিন্তু জীবন হোঁচট খায় ইঁদুর খাওয়া পতাকায়। আমরা প্রত্যেকেই এখন রাষ্ট্র-সংগ্রাম অথচ ব্যালটে বন্দি হয় কাটা জিভ। রাত ঘনালে গা ঘেঁষাঘেঁষি বোদ্ধার উপঢৌকনে উপচে ওঠে মশালের আগুন।

ব্যালকনির রেলিং-এ হাত ঠেকিয়ে চা খাই। রাস্তায় মিছিল যায়। স্বাধীনতার মিছিল। প্রতিবাদের মিছিল। শোকের মিছিল৷ যেন মিছিলই আমাদের পথ। মিছিলই আমাদের পরিণতি৷ যেন লাল পিঁপড়ের জীবনসুখ। পেছন ঘুরে তাকাই না। আমরাও কি ফেরোমন নিষ্ক্রমণ করি? কাকে জিজ্ঞেস করব এ কথা? জাতি ঘুমিয়ে আছে সুখের পালঙ্কে।

সুখের স্বপ্নে মাঠের পর মাঠ আফিম চাষ। ব্রিটিশের গটমট জুতো৷ পোস্তবাটা ভাতের সুখে দুপুর ফুরোয়। অথচ সোনারও বিকল্প হয়, জাতি জানে, জাতি নিরুপায়, জাতি ক্ষণিকের জিভে তা দিতে চায়৷ তারা জানে বেল পাকলে কাকের কি! রাজা আছে, রাজা বদলাবে, নতুন রাজা আসবে। একদিন মস্ত রাজাও ফিরে গিয়েছিল নিজের ঘরে৷ সারা মাটিময় রেখে গেছিল পায়ের ছাপ৷ বৃদ্ধ চোখ, সফেন চুল—দূর থেকে সে আজও দেখে, যে পথে একদিন সাপ ঢুকত, মুখ ভর্তি ইঁদুর কিংবা ব্যাঙ নিয়ে সেই পথে জাহাজ ঢোকে, কন্টেইনার ভর্তি রঙিন কাগজ।

জাতি জানে, দেওয়ালের ছায়া দৌড়োয় দেওয়াল জুড়ে ৷ কিন্তু খিদে পেলে সংবিধান তাকিয়ে থাকে— নির্বাক রক্তপাত। যে কটা দ্রোহ বর্ষপূর্তির মুখ দেখে, পোয়াতি হয়, তাদের স্তন দুধের ভার চেনে—জানে ক্রমশ বংশবিস্তার হল এক প্রকার নিরাময়হীন চর্মরোগ, যা আপোষ চেনে না অথচ অক্লান্ত প্রসবশ্রমে নিভে আসে নক্ষত্রযোনী।

আমরা ব্যালকনিতে না হোক বসার ঘরে কিংবা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, বসে, দিনে আটবার চা খাই। কারণ দু’শ বছরের পরাধীনতার বীজ আমাদের বিকেলবেলায় এক কাপ চা খেতে শিখিয়েছিল। শিখিয়েছিল অল্প অল্প করে রোদ ওঠা আকাশের গলা আলতো হাতে কেটে ফেলতে। আমাদের সময় নেই। কাল ছুটছে মহাবিশ্বের গতিতে। তাই যোনী ছিঁড়ে যজ্ঞ করি। শিশুর মুখে তুলে দিই তারই মায়ের কাটা স্তন —

জাতি জানে দ্রোহের অক্ষর। জাতি দেখে মিছিলে হেঁটে যাচ্ছে পঙ্গু রাষ্ট্র আর বিকলাঙ্গ সংবিধান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *