পাশবিক মনুষ্যত্ব
পলি বাগচি
রাতের আলো নিভে এলে যখন মন অনুভূতি কুড়োয়, তখন কোনো এক বৃষ্টি ভেজা শীতল সন্ধ্যায় আশ্রয় নিই এক দোকানের নিচে। হাজারো মানুষ তাদের গা ভিজিয়ে চলে যাচ্ছে যে যার কাজে, নেহাত সময়ের খুব দাম হওয়ার কারণে শরীরের তোয়াক্কা না করেই ছুটে চলেছে যে যার গন্তব্যের দিকে। আবার হাই রোডের পাশে সমাজের তোয়াক্কা না করে কিছু, সময় কাটানো প্রেমের মালিকরাও দুঃখ ভোলানোর জন্য বৃষ্টি ভেজা রাতে অনুভূতি প্রকাশে ব্যস্ত। সত্যিই এরকম এক পশলা বৃষ্টি খুব কমই দেখেছে আমার বাড়ির ছোট্ট খরগোশটি, দেখলাম কোথা থেকে বৃষ্টি ভিজে ঘরে এসেছে, বিগত কিছু বছর আগে আমার অংক মাস্টার মশাই আমাকে জোর করে দিয়েছিল ওকে, হাজার বারণ করা সত্যেও! ছোটবেলায় আমার একটা পোষ্য বিড়াল জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার পর আর কিছু পোষ মানাতে চাইনি। সে যাই হোক, দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার, আমি আর আমার খরগোশ দুজনে বসে বিস্কুট খাই একসাথে, তারপর সকাল সাড়ে ছটার ইতিহাস টিউশনে রওনা হই, এসে দেখি এদিক ওদিক মনের সুখে খেলাধুলা করছে,, এর আগে অনেকে ওকে মেরে ফেলতে চাইলেও কোনোমতে বেঁচে সে ঘরেই এসেছে বারবার, আমার চেয়ে হাজারগুন ভালো দৌড়ায়। দশম শ্রেণীর ভৌতবিজ্ঞান বই দাঁত দিয়ে কেটে সবার কাছে খুব বকা খেলেও আমি ওকে বকিনি, কারণ বইয়ের নকশাটা খারাপ লাগছিল না।
ভাবছো কেন বলছি ওর কথা? আসলে ওর কথা আমার প্রায়সই মাঝরাতে আকাশে তারা গুনতে গিয়ে মনে পড়ে যায়, দেখবে আমাদের জীবনে অধিকাংশ মানুষই তাদের গল্প বলে যায়, কে কার আগে বলবে এই প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে,, যদিও চুপ করে শোনার মতো এবং বোঝার মত মানুষ থাকলেও জীবনে তাদের আনাগোনা খুব একটা নেই বললেই চলে,, ও অবাক দৃষ্টিতে আমার সব কথা শুনতো, হয়তো মনোযোগ দিয়ে বোঝবারও চেষ্টা করতো, তবে উপরওয়ালা তাদের কথা বলার অনুমতি দেয়নি কারণ এই কথার মধ্যে অনেক ক্ষমতা লুকিয়ে আছে, একটা হাসি খুশি মানুষের নিহত হওয়ার জন্য মুখ থেকে নির্গত হওয়া কিছু কথাই যথেষ্ট।
তারপর? তারপর আবার কি.. সেদিন দুপুরে বসে ভূগোল পড়ছিলাম, হঠাৎ বাড়ির লোকের অদ্ভুত চিৎকারে রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি, একটি কুকুর হিংস্র দাঁত দিয়ে ঘাড়ে কামড়ে মুখে করে নিয়ে যাচ্ছে ওকে, কিছুক্ষণের জন্য থমকে যাই আমি। জীবনে প্রথম সেদিন ওর মুখ থেকে আওয়াজ শুনি। কোনা কিছু না ভেবে খালি পায়ে দৌঁড়ে জঙ্গল, স্কুল, বাড়ির পর বাড়ি অতিক্রম করে যাযাবরের মতো ওকে খুঁজে বেড়াই, চোখের সামনে দিয়ে ওর এভাবে যাওয়া সেই মুহূর্তে মেনে নিতে পারছিলাম না, যাযাবরের মতো ওকে খুঁজে বেড়াই।
এক পরিত্যক্ত বাড়ির অভ্যন্তরের জঙ্গলে প্রথমে ওকে নিয়ে যায় কুকুরটি, তারপর মেঘের মতো সাদা সৌখিন লোম গুলো পড়ে আছে দেখে, সমস্ত শক্তি দিয়ে আবার পিছনে ছুটি,, বাড়ির পাশে স্কুলের ভিড় ঠেলে বড় রাস্তা পেরিয়ে ওকে অনেক খুঁজলেও প্রিয় বন্ধুটির সাথে শেষবারের মতো দেখা হয়নি, শেষ বার আমায় দেখতে পারেনি সে।
সেদিন স্পষ্ট হার্টবিট শুনতে পাচ্ছিলাম নিজের, হয়তো প্রেমে পড়লেও কখনো এরকম অ্যাড্রিনালিন সিক্রিশন হয় না,,! মেনে নিতে সে মুহূর্তে খারাপ লাগলেও সবটা বোঝার চেষ্টা করলাম। আমার আবার একটা অভ্যাস আছে, কারোর দোষ ধরার আগে নিজের দোষটা খোঁজার যথাসম্ভব চেষ্টা করি,, সবটা দিয়ে ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।
অনুভব করি, আমরাও তো দিনের পর দিন নানা অজুহাতে প্রাণী হত্যা করেই চলেছে, এমনকি মানুষ হত্যাও,..! কখনো স্বাদ, প্রোটিনের অভাব ইত্যাদির দোহাই দিয়ে একের পর এক নিষ্পাপ প্রাণ ধ্বংস করে চলেছি, এটাই আমাদের আধুনিক সভ্যতা, যা নিয়ে আমরা গর্ব করি, কোনো উৎসব হলেই তাদের নিজেদের বলি হতে হয় আমাদের কাছে। উৎসব মানে কি সত্যি আমরা বুঝি ??
তারপর থেকে কুকুরটার প্রতি প্রথমে প্রচন্ড ক্ষোভ হলেও, পরে আর হয়নি।,, কি আর বলবো-
হয়তো মানুষের মতোই নাহয় সেও পাশবিক ছিল..!

