ছোট গল্পঃ শুভ চিন্তক – পরমা মজুমদার

শুভ চিন্তক
পরমা মজুমদার

হ্যাঁ হ্যাঁ আত্মহত্যা করেছি, আমি এইমাত্র কয়েক ঘন্টা আগে !!একটু আগেই হাসপাতালে আমার দেহটার কাটাছেঁড়ার কাজ মিটল ।এখন আমার দেহটাকে নিয়ে যাচ্ছে আমার বাপের বাড়ির দিকে । আমার পিসতুতো দাদা পিকু, আমার বন্ধু স্নিগ্ধ ও প্রাঞ্জল আর আমার দেওর পৃথ্বীশের কাঁধে করে আমি বাবার বাড়ি যাচ্ছি ! সঙ্গে যাচ্ছে আমার প্রাণেশ্বর ! আমার স্বামী! আমার ইহকাল পরকাল অণীশ ! খুব কাঁদছে ও !! আচ্ছা !! ও এতো কাঁদছে কেন ? ওতো আমার শরীর থেকে ওর ফুলশয‍্যার রাতে দেওয়া – কন‍্যাপণের টাকায় কেনা হীরের আংটি, কন‍্যাদানের সময় বাবার দেওয়া সোনার বিছে হার আর সোনার ফার্ফো বালা খুলে নিয়েছে । তাহলে !! ওহো ! ভুলে গেছিলাম বাবা মারা যাবার সময় স্বল্প কিছু স্থাবর সম্পত্তি আমার নামে রেখে দিয়ে গেছে ; তালেগোলে সেই গুলো তে সই করানোর সময় পায়নি । সেই আফশোষেই এত কাঁদছে বোধহয় ! আহা রে ! বিশ্বাস করুন, -খুব – খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার শরীরটা থেকে বেরোতে ! অসহ‍্য জ্বালা করছিল ! বুক উতলে কান্না ঊঠে আসছিল আমার ; সম্পর্কের মায়া জাল থেকে বের হতে ।। ঐজন‍্যই তো একাধিক বার চেষ্টা বিফলে গেছে ! কিন্তু আত্মহত্যা করা ছাড়া আর তো কোনো উপায় খোলা ছিল না আমার ! ওরা তো আমার খাবারের সাথে ওষুধ মিশিয়ে খাওয়াতো ; যাতে অদূর ভবিষ্যতে আমি মানসিক সন্তুলান হারিয়ে ফেলি । রোজ রাতে শোবার সময় অণীশ একটা ইঞ্জেকশান ফোটাতো; ফোটাবার সাথে সাথে সারাটা শরীর হালকা জ্বলতে থাকত, কয়েক মিনিট পযর্ন্ত ! তারপর চোখের পাতা ভারী হয়ে আসত ; আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়তাম আমি । নিতে না চেয়ে প্রতিবাদ করলে মারধর পযর্ন্ত করত । আচ্ছা !! এতক্ষণ ধরে বক্ বক্ করছি ; তবু আমি আমার পরিচয়টা দিইনি ; না !! আমার নাম শ্রীমতি মৌসুমী পাল ;মানে একটু আগে অব্দি ছিলাম। এখন স্বেচ্ছায় স্বর্গীয়া মৌসুমী পাল হয়ে গেছি ; চাকরি করতাম সরকারি হাসপাতালে ; ডাক্তার ছিলাম ওখানকার । বছর খানেক আগের কথা ; সেদিন নাইট ডিউটি ছিল আমার ; হঠাৎ রাত একটা নাগাদ পেটে ছুরিকাবিদ্ধ – গুরুতরভাবে আহত একটি ছেলেকে নিয়ে গোটা পাঁচ ছয় লোক হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে ছুটে এল, ছেলেটিকে বাঁচাবার জন‍্য । ওদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারি, দুটি সমাজবিরোধী গ‍্যাংয়ের গ‍্যাং – ওয়ারের ফলে এই র্দূঘটনা ; আমি ঘটনার গুরুত্ব বুঝে তখনই চিকিৎসা শুরু করে দিই । সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাই অপারেশন থিয়েটারে ; অপারেশন শুরুর আগেই টেবিলে ছেলেটি অতি রক্তপাতের কারণে মারা যায় । এরপর পোস্টমর্টেম হয় ; পুলিশে খবর দিলে পুলিশ আসে ; পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বেরোলে দেখা যায় ; গলব্লাডারে প্রায় ইঞ্চি দুয়েক ছুরি ঢুকে গিয়ে অধিক রক্তপাতের ফলে ছেলেটির মৃত্যু হয়েছে। আমি সেটাই ডেথ সার্টিফিকেটে বয়ান করতে যাব ; এমন সময়ে সেখানে স্থানীয় কাউন্সিলর তার দলবল নিয়ে হাজির । হুকুম , ডেথ সার্টিফিকেটে সত্যিটা লেখা যাবে না ! লিখতে হবে সিম্পল পথ র্দূঘটনা । বললাম , ‘ ছুরি ঢুকে ছিল পেটের মধ্যে ; লিখে দেবো পথ র্দূঘটনা ! স্টেটমেন্টতো সত‍্যের পঞ্চাশ ফুট দূর দিয়ে ও যাবে না ! ‘, বললাম আমি । পৌরপিতা একাধারে গাম্ভীর্য ও একাধারে মস্তানি ভাব বজায় রেখে উত্তর দিল, ‘যেতে হবে না !! ভুলে যাবেন না ! এই হাসপাতালের প্রতিটি বিল্ডিং য়ের প্রতিটি ফ্লোরে যথেষ্ট জলের ব‍্যবস্থা আমিই করে দিয়েছি । শুধু এটাই নয়, হাসপাতালের চারিদিকে চারটে ময়লা ফেলার ভ‍্যাট ; এসব তো আমিই করে দিয়েছি। নাকি !!’। ‘এইসমস্ত করা আপনার ডিউটির মধ‍্যে পড়ে ; তাই করেছেন। কাউকে কোনো দয়া করেননি । এখন আমার ডিউটি – ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত‍্যুর সঠিক কারণ ঊদ্ধৃত করা ; আমি সেটাই করব। কারণ ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত‍্যুর কারণ ভুল লিখলে আমার চাকরি চলে যেতে পারে । ‘ বলতে বলতে রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে পড়লাম আমি । কিন্তু তারা নাছোড়বান্দা ! নেতামশাই সুপারকে রীতিমত ধমক চমক দিয়ে , শেষপর্যন্ত তাকে দিয়েই সার্টিফিকেটটা লিখিয়ে নিল । ব‍্যপারটা তখন কার মতো মিটে গেলেও , ওরা উৎপাত তখন থেকে শুরু করল , যখন কেসটা কোর্টে উঠল । কারণ কোর্টে ছেলেটির বাড়ির লোকেরা জানিয়ে দিল, সুপার নয় আমি ছেলেটিকে শেষ চিকিৎসা টা করিয়েছিলাম । ব‍্যাস ! শুরু হয়ে গেল চাপ খাওয়া ; একদিকে কোর্টে সত‍্যিটা বলার জন‍্য ছেলেটির মায়ের করুণ আর্তি ! অপরদিকে, কাউন্সিলরের উত্তরোত্তর ফোন। টেনশন নিতে পারলাম না ! অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়লাম । ব‍্যাস্ নেতামশাই তার কাজ শুরু করে দিল । ছুতোয় – নাতায় টাকার বান্ডিল সহমর্মিতার প‍্যাকেটে মুড়ে পাঠাতে লাগল ! টাকা পেয়ে অনীশ তো বেজায় খুশি ! সে অনায়াসে পৌরপিতার উপদেশ মত, আমার বান্ধবী সৌমালীর লেখা প্রেস্ ক্রিপশানের ওষুধ বদলে দিতে লাগল। ভাবছেন কি ঊদ্দেশ‍্য ! ঐ যে বললাম , আমাকে সেমিপাগল প্রতিপন্ন করা । যতই হোক ; ডাক্তার আমি ! ব‍্যপারটা তাই আমার চোখে ধরা পড়ে গেল । ওদের বুঝতে দিলাম না। কিন্তু শরীরের তখন যা অবস্থা ! প্রতিবাদ করে বাড়ির বাইরে যাবার ক্ষমতা আর আমার মধ‍্যে অবশিষ্ট নেই ! স্থির করলাম , ওদের ইচ্ছার অধীন হয়ে তিলে তিলে মরব না ; মরব তো মরব একেবারেই স্ব – ইচ্ছায় মরব ; তবে তার আগে আমার কথা ; আমার মেয়েবেলার কথা, অঙ্কুরে ঝরে যাওয়া আমার প্রথম প্রেমের কথা, ডাক্তার হওয়ার পথে আমার সংগ্রাম এবং সেই সময় থেকে আজ অবধি কঠিন সময়ে পাশে পাওয়া সেই পরম বন্ধু – সেই শুভচিন্তকের কথা, আমার দুঃখ , আমার কষ্ট, পাওয়া – না পাওয়া, সাফল্য – ব‍্যর্থতা সমস্ত কিছু লিখে যাব, আমার প্রিয় ডায়েরিটাতে । শারীরিক ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও সাহস করে লিখে ফেললাম সমস্ত কিছু ! মেলে ধরলাম নিজেকে, নিজের দৈণ‍্যতাকে ডায়েরিটার কাছে । লিখে ফেলে অনেক হালকা লাগল ; মনে হল এতদিনের জমানো কষ্ট থেকে মুক্তি পেলাম আমি ! এরপর বাড়ির রান্নার দিদি সীমাকে আমার নিজের প্রেসক্রিপশান প‍্যাডে লিখে দিয়ে দুপাতা ঘুমের ওষুধ আনতে বললাম ; ও এনে দিল। নিজের কাছে আরো খান চারেক পাতা ছিল ; সবমিলিয়ে গোটা ষাটেক ওষুধ জোগাড় হল। ভ‍্যানিটি ব‍্যাগে রেখে, ব‍্যাগটা লুকিয়ে দিলাম । এরপর দুদিন ধরে নিজের সাথে নিজে সময় কাটালাম ; ভালো ভালো মুভি দেখলাম, গান শুনলাম , প্রিয় গল্পের প্রিয় অংশগুলো একাধিক বার পড়লাম ; কারণ এরপর তো আর চাইলেও পড়তে পারব না, তাই না !! তাই শেষবারের মত পড়ে নিলাম । পুরোনো অ‍্যালবামগুলো খুলে স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে কখনো একদম ছোটবেলায় , কখনো শৈশবে ,আবার কখনো প্রাক্ যৌবনে ঘোরাফেরা করলাম ।একবার এক বর্ষার দিনে আমি আর দাদা পাড়ায় বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে জামাকাপড়ে গুচ্ছখানি কাদা মেখে এলাম ! মা দেখে রেগে আগুন হয়ে গিয়ে আমাদের হাতের সামনে রাখা খুন্তি দিয়ে মারতে লাগল ! বাবা সেই দেখে আমাদের বাঁচাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে ; তৎক্ষণাৎ ছবি তুলতে লেগে গেল । পরবর্তীকালে যখনই তার আমার হাতের চা খাওয়ার ইচ্ছা হত ; তখনই ছবিটা আমার বন্ধুদের দেখাবার ভয় দেখিয়ে আমাকে দিয়ে চা বানিয়ে নিত । দাদাভাইকে ও সমনীতি প্রয়োগ করে, তার হাজারো অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাজারে পাঠাতো । ছবিটা দেখে চোখে জল চলে এল। আমি ভালো করেই জানি, আমার চলে যাওয়ার দুঃখ সবাই ভুলে গেলেও মা আর দাদাভাই কোনোদিন ভুলতে পারবে না । যাইহোক অবশেষে আমি ইহলোকের মায়া কাটাবার কাজটা করে ফেললাম । রাতের খাওয়া সেরেই অণীশ ইঞ্জেকশান দেবার ঘন্টা দুই আগেই ঐ ষাটখানা ওষুধ খেয়ে নিলুম । ব‍্যাস্ ! ঘুমের মধ‍্যেই শেষ । এটাই তো চেয়েছিলাম আমি – নিজে নিজেকে ফেয়ার ওয়েল দেওয়া । ঐতো আমার মা মেঝেতে পাতলা সাদা চাদরের ওপর রাখা আমার শরীর টা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে ! ! মা আমার মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে অঝোরে কাঁদছে ; বলছে, ‘ সুমি কি কষ্ট ছিল তোর? আমাকে বল্লি না কেন মা!! ‘ মনে পড়ছে আমার ! ছোটোবেলায় মা এইভাবে আমার মাথায় – চুলে বিলি কেটে দিত , আর আমি আরামে ঘুমিয়ে পড়তাম! কতবছর পর আবার মা মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ! কিন্তু কই আমি তো আর ঘুমোতে পারছিনা !
ছোটো পিসি কাঁদতে কাঁদতে মার হাতটা সরিয়ে দিল,” তোমার সুমি এখন চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছে বৌদি ! ওকে বিরক্ত কোরোনা।’ এবার আমার ঘুম না আসার কারণটা বুঝতে পারলাম ! ঐ তো দাদা আসছে! একি অবস্থা হয়েছে ওর ! আলুথালু রূক্ষ কেশ, কয়েক ঘন্টায় দাদাভাইয়ের বয়স যেন অনেকটা বেড়ে গেছে ! কাউকে বোধহয় ফোন করছে দাদা ! যাই গিয়ে আড়ি পেতে শুনি তো ; আমার মৃত্যুর যাতে সঠিক তদন্ত হয় ; তার জন‍্য ফোনে তদ্বির করছে । ……………………………………সবই সাড়া হল, কিন্তু বিদায় কালে আমার শুভ্চিন্তককে ধন‍্যবাদ বলা হল না।সেই শুভ্চিন্তক , যে কিনা দূরে থেকে ও আমাকে আমার সকল বিপদ থেকে রক্ষা করে !! কখনো নৈতিক সর্মথন করে ; কখনো বা আমার সাথে ঘটা অণ‍্যায়ের সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়ে !! আর বোধহয় সে আসবে না । এখন আমি নিমতলাতে বাকি দুজনের সাথে শুয়ে রয়েছি । প্রথমজন আশি বছরের এক বৃদ্ধ , নিউমোনিয়া অসুখে মারা গেছে । আর দ্বিতীয় জন বছর তিরিশের এক যুবক, পথ দূর্ঘটনায় মারা গেছে । ওর বাড়ির লোক খুব কান্না কাটি করছে। দূর থেকে কেঊ যেন হন্তদন্ত হয়ে আসছে না !! হ‍্যা হ‍্যা ! ঠিক ঠিক ; একজন সৌম‍্যকান্তি যুবক, পরনে সাদা ফুল শার্ট, ঈষৎ ছাইরঙা প‍্যান্ট, চোখে রিমলেস চশমা ;হ্যাঁ এইদিকেই তো এগিয়ে আসছে। আরে !! এই তো সেই আমার শুভ্ চিন্তক ; কাছে আসতে ঠিক দেবদূতের মত লাগছে । আমাকে খুঁজে পেয়ে আমার পাশে এসে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ।আরে ! এতো কাঁদছে শুভচিন্তক । দুচোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরে পড়ছে ! হঠাৎ দেখতে না পেয়ে অনীশ শুভ্ চিন্তককে মারল এক ধাক্কা । শুভ্ চিন্তক কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল । আসলে অণীশের একটু তাড়া ছিল ; তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাবার তাড়া । তাই দান আসতেই একটুও সময় নষ্ট না করে আমার শরীরে ঘি সংযোগে ; মুখে আগুন দিয়ে দিল। ছিটকে ঊঠে গেল ওখান থেকে শুভ্ চিন্তক ; ঊঠে গিয়ে লম্বা বারান্দায় ;যার নীচ দিয়ে গঙ্গা বয়ে চলেছে ;সেখানে পিছনদিকে মুখ করে অঝোরে কাঁদতে লাগল । শুভ্ চিন্তক , তুমি ওভাবে কেঁদো না ! দ‍্যাখো! আমি আর এ শরীরে থাকতে পারছি না ; খুব কষ্ট হচ্ছে আমার ! আমাকে ধরাধরি করে চুল্লিতে ঢুকিয়ে দিলো ওরা । ওগো ! তোমরা একটি বার শোনো ; তোমাদের সবাই কে ছেড়ে যেতে তো আমার কষ্ট হচ্ছে গো !! খুব ভয় পাচ্ছে ; খুঊঊঊঊব শীত করছে ; চুল্লির আগুন ও কিচ্ছু করতে পারছে না আমার ! কেউ শুনতে পেল না আমার কথা ; সবাই চলে গেল । শুধু শুভ্চিন্তক এককোণায় পড়ে রইল ।

2 thoughts on “ছোট গল্পঃ শুভ চিন্তক – পরমা মজুমদার

  1. খুব সুন্দর গল্প । ভালো লাগলো। মনটাই খারাপ লাগছে।

  2. দারুণ গল্প।ধন্যবাদ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

Leave a Reply to ভূমিকা গোস্বামী Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *