প্রবন্ধঃ ধপধপির বাবা দক্ষিণেশ্বর-প্রদীপ কুমার দে

বারুইপুরের অন্তর্গত ধপধপি গ্রামে বাবা দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের লোকদেবতা হলেন দক্ষিণরায়। তিনি সাধারণ গরিব প্রান্তিক মানুষের রক্ষার দায়িত্ব নেওয়া এক মানুষ অবতার, স্বর্গীয় বা কোন কাল্পনিক দেবতা নন।

শুরুতেই এক বাস্তব জীবনের কথা বলি তারপর না হয় প্রবন্ধের মূল বিষয়ে আসা যাবে, যদিও এটি নিছক একটা গল্প নয় অতি অবশ্যই সেইসব হতভাগ্য অধিবাসীদের কথা, যাদের রক্ষার্তে এই লোকদেবতার আবির্ভাব ঘটেছে। অসহায় মানুষজন তাদের বাঁচার তাগিদে এবং জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে এই দেবতার পায়েই পুষ্পাঞ্জলি দেয় সেই অবতারকে কাতরভাবে ডেকে এবং সাড়া পেয়েই।

সুন্দরবন ঢুকছি টুরিস্ট ব্যুরোর বড় লঞ্চে। দেখতে একটা ছোট জাহাজ। ম্যাংগ্রোভের জঙ্গলের পাশ দিয়ে, উজানে তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছি। একবার ডেকের মাথায় চড়ি তো একবার নিচের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাই আন্ডারগ্রাউন্ড কেবিনে। ছোট মেয়ে আনন্দ পেয়ে বসেছে, বড় লঞ্চটাকে জাহাজ ভেবে লাফালাফি করছে। খাবার আয়োজনে খামতি নেই, পরপরই তার পরিবেশন চলছে। ডেকের ছাদে গরম গরম কাটলেট ভাজছে বিজলী গ্রীল। খেয়েদেয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস – খুব আমেজ আনে, যখন চারিদিক জল আর মাথায় পরিস্কার নীলাকাশ ঘীরে ধরেছে। বলতে গেলে সরকারি পরিচালনাধীন ভ্রমন। কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, হয়ও নি। ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ উইথ দেম আন্ডার টোটালি সেফ।
প্রত্যেকেই আনন্দ উপভোগ করছে। লঞ্চ যাওয়ার সময় ডেকের সামনে ছোট্ট ব্যালকনিতে বসে থাকলে সবচেয়ে বেশি আনন্দ। হু হু বাতাসকে কাটিয়ে এগিয়ে চলা চুল এলোমেলো করা আর নীচে জলকে দুভাগে চিড়ে এগানো। উপরে নীল, নিচে নীল, নীল দিগন্তময়।

প্রথম দিন প্রথম জলাজঙ্গলে নিজেকে হারিয়ে ফেলা, এক সুখানুভূতি। সারাদিন নেমে উঠে ঘুরেফিরে খেয়েদেয়ে কেটে গেল। ছোট ডিঙ্গি নৌকার সাহায্যে পাড়ে যাওয়া, রাইফেল সঙ্গে উর্দিধারীর বেষ্টনীতে যতটা সম্ভব ভিতরে প্রবেশ করা, ভয়ের কথা ভুলে নিজেকে একজন বড় দামী কেউ ভাবার এও এক বড় সুযোগ পাওয়া। জঙ্গল ঘুরে, বড় জোর পঁনেরো মিনিট পরে আবার ফিরে কাদায় পা ঢুকিয়ে, নৌকায় চড়া আর লঞ্চে এসে ওঠা। কিছু না দেখতে পাওয়ার মনোক্ষোভ রয়ে যাওয়া -পয়সা উশুল না হওয়ায়।
সন্ধ্যায় নাচ গান সিনেমার ব্যবস্থা, দামী টিফিন। লঞ্চের চারদিকে আগুন জ্বলে ওঠে সুরক্ষার বেষ্টনীর জালে। ফোরেষ্ট অফিসার এসে খোঁজ খবর নেয় –সবই সরকারি ব্যবস্থার সুফল।

এই নিয়েই কথা হচ্ছিল, অফিসারের সঙ্গে, জানা গেল এ স্থান মোটেই নিরাপদ নয়,পদে পদে বিপদ আছে। যারা খুবই সাধারণ ভাবে যায় আসে,তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নজর দেওয়া উচিৎ।

রাত দশটার পরে চেঁচামেচি শুনে কেবিনের বারান্দায় গিয়ে বহুদূরে ,অস্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান হল কোন জন্তুর গতিবিধি। মনে হল তীব্র বেগে কেউ জলে সাঁতার কেটে পাড়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। হইচই পরে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে সে পগারপার। ওটা নাকি বাঘ!
সবাই বেশ রোমাঞ্চকর কথাবার্তা বলে চুপ মেরে গেল। অনেকে আবার ভয় পেয়ে ‘ এখানে বেড়াতে আসা উচিৎ নয় ‘মন্তব্য করেও ফেলল। সবাই শেষে মেনে নিল এই স্থান সুরক্ষিত, ভয়ের কিছু নেই।

পরের দিন লঞ্চ এগিয়ে চলল। কয়েকটি দ্রষ্টব্য স্থান পরিদর্শন করাবে সংস্থা। যখন সজনেখালি গিয়ে পৌঁছুলাম তখন মধ্যাহ্ন। ছোট ডিঙি নৌকায় ভেসে গেলাম পাড়ে। রাইফেলধারীরা এগিয়ে ঘিরে নিয়ে চলল আমাদের। আমরা কুমীর প্রকল্পটি ঘুরে দেখলাম।

ফেরার একটু বাকি। সবাই একটু ঘুরছে, বসে গল্প করছে, অনেকে টাওয়ারের উপর থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবলোকন করছে। আমি একা থাকছি দেখে ডিঙি নৌকার এক মাঝি কাছে এসে কথা বললে — বাবু – কি কলকাইতা থাইকা?

আমি ঘাড় নাড়লাম।

— এহানে সুবিধা লাই —

আমি ওকে দেখলাম ভালো করে।

ও কি বুঝলো জানি না। ক্ষয়ে যাওয়া, কালো দাঁত বার করে জানাল,
— হামি মারুত মুর্মু। পাসে বস্তি আচে। কাল রেতে হামার ভায়ের ছোট ছা’টারে বাঘে লে গেছে। বড় কষ্টে আছে উহারা।

অন্যমনস্ক ছিলাম। কথাগুলো যেন আমাকে নাড়িয়ে দিল। বড় বড় চোখ নিয়ে মারুত মুর্মুকে দেখলাম,
— কি বললে — কাল রাতে ?

মেলাবার চেষ্টা করলাম –কাল রাতে একটা বাঘ দেখা গেছিল — তাহলে কি সেটাই?

— যাইবেন? হামার সাথ?

— এখন? সে কি? সময় কোথায়?

— অসুবিধা হবেক লাই। যাবে আর ফিরবে। ইখানে ঘন্টাভর বিরাম। হামি তো আছিই। অন্য ডিঙির মাঝিরাও ইখান থিকা ওইখান গিয়া ভিরেছে। সব নিজজন না! বিপদে আপদে পাইশ্যা না পাইলে চলে?

ব্যাপারটা বুঝলাম। এখন স্থানীয় সকলেই ওখানে।
তালে অসুবিধার কিছু নেই।

কাদামাটি মারিয়ে ভয়ার্ত বুকে জংগলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়লাম ছোট্ট লোকালয়ে। পাঁচটি পরিবারের বাস। কুটির জঙ্গলে। কান্নার রোল উৎসারিত অঞ্চলটির পরিবেশ কে বেদনাবিধুর করে তুলেছে।

উঠোনে চোখ চলে গেল, রক্তমাখা একটি দলাপাকানো শিশুর মৃতদেহ ঘিরে ক্রন্দন রোল উঠছে। শক্তপোক্ত আধিবাসীরা গিয়ে শিশুটির মৃতদেহটি তুলে এনেছে, বাঘের মুখ থেকে। রাতে অনুসন্ধান করতে পারেনি, না হলে শিশুটিকে বাঁচানো যেত- এই যুক্তি ওই দুর্ধর্ষ লোকেদের, দাবীও। ষন্ডমার্কা চেহারার লোকগুলি নাকি বাঘের সঙ্গে লড়াই করেই এই জঙ্গলে টিকে আছে। এখানে নাকি পদে পদে ভয়। জলে কুমীর আর ডাঙায় বাঘ। এই দুই জন্তুর মোকাবিলা করেই তাদের দিন শেষ হয়ে যায়।

বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলাম না বেরিয়ে বাইরে চলে এলাম। আনন্দ করতে এসে এই অভিজ্ঞতা হবে ভাবিনি। অভিজ্ঞতা আমার জীবনের সম্পদ নিঃসন্দেহে তথাপি এই দুঃখজনক ঘটনার সাক্ষী হিসেবে নিজেকে মেনে নিতে পারলাম না।

বহু অঞ্চল ঘুরে সেবার সুন্দরবন ভ্রমন শেষ করেছিলাম। ফেরার দিন কষ্ট বেড়ে গেল অনুভবে, ভাটার টানে, উজানের বিপরীতে, যখন আমাদের চিত্ররেখা লঞ্চ আমাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল।

আমরা দুর্গম স্থানে ভ্রমন করতে যাই আনন্দ আহরণে কিন্তু ওখানকার আদিবাসীরা যে লড়াই চালিয়ে বেঁচে থাকে, এবং আমাদের আনন্দ বর্ধনের সহায়ক হন তা আমাদের গোচরে আসে না। জীবন সুখ দুঃখ মিলিয়ে। আনন্দ খুঁজতে গিয়ে দুঃখ নিয়ে ফিরতেও হয় — আনন্দ সীমা লঙঘন করলে তার পরিণাম সুখের নাও হতে পারে — এ শিক্ষা আমার পাওয়া হয়ে গেল।

আদিম উল্লাস তখন তার চোখে – মুখে। অত্যন্ত ক্রিপ্রতার সঙ্গে আবুল তার হাতের শাবলটা ছুঁড়ে দিল, ছুটে আসা রয়েল বেঙ্গলটার দিকে, নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা, যেখানে তাকে পলায়মান হওয়ার তাগিদ দিয়ে চলেছে, সেখানে তার শিকার কেও ছাড়তে রাজী নয় এই মাঝবয়সী শিকারী আবুল মুস্তাফা। পিছু দৌড়ে- এগিয়ে, পিছিয়ে আবার এগিয়ে,অপেক্ষমান তার শেষ অস্ত্র রাইফেলের গুলিটা ছুটে বেড়িয়ে গেল। শাবলের সঠিক নিশানা বাঘটির মাথা ফুঁড়ে দিয়েছিল, ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল ,এবার গুলিটা তার বুক ফুঁড়ে দিল। প্রচন্ড হুংকারে গর্জে উঠল, মানুষের হাতে জানোয়ারটা লাফিয়ে উঠল এঁদো মাটির উপর। তারপর ধপাস করে নেতিয়ে পড়ল। ছটফট করে থেমে গেল তার প্রকান্ড শরীর, থেমে গেল জন্তুটার প্রাণ!

সুন্দরবনের সুন্দরী গাছের আড়ালে নিজেকে লুকানো অর্থহীন। এগিয়ে গেল চরের দিকে। ততোক্ষণে ডিঙি নৌকায় অন্য তিন শাগরেদ, অনুমিয়া, হাফিজ আর কালু এসে পৌঁছে গেল।
খানিক সময় ধরে ডিঙিটা মাঝদরিয়া থেকে পাড়ে ভিরলো। আবুল হাত তুলে ইশারা করল। ইশারা ভি কাফি! ওরা তিনজনে নেমে এল, সঙ্গে নামালো বাঁশ, দড়ি ইত্যাদি সরঞ্জাম।

আবুল হাতের চেঠো বাঁয়ে থেকে ডাঁয়ে নিয়ে দেখাল, — কাম খতম!

তিনজনের চোখে সূর্যাস্তের আলো ঠিকরে পড়ল, অনাবিল আনন্দে মুখের কাঠামো বদলে গেল, মুনাফার আশায়। ঘরে পরিবার, সন্তান আর, আর বেশ কিছুদিন ধরে নিজেদের গরম রাখার আশাবহ ইঙ্গিতই এর মূল কারণ।

কিছু সময় অতিবাহিত হলে, আমেজে চড়ায় বসে চারজনা প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে গরল গলায় ঢেলে, বিড়ি ধরাল, সুখের টান আমেজে মন ভরাল, সজাগ রইল কারণ বেশি সময় দেওয়া যাবে না। খবর হয়ে যাবে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা করে মোটা দড়িতে বেঁধে বাঁশে ঝোলাতে বেশি সময় নিল না, চারজনের কাঁধে ডিঙিতে সওয়ার হলেন সুন্দরবনের রাজাধিরাজ। ডিঙি ছেড়ে চলল উজানে, ততোক্ষণে সূর্যিমামা পাঠে বসে গিয়েছেন।

ম্যানগ্রোভের জংলা জমিকে পাশ কাটিয়ে, মাতলা নদীতে নিকষ কালো জলে ডিঙি বেয়ে বেয়ে চলা। ঢালি আর মুন্নি ভাগাভাগি করে দাঁড় টানে , নিশুতি রাতে নিজেদের শরীর কে বিলিয়ে দিয়ে ,পেটের টানে, মাছ আর কাঁকড়া ধরার তাগিদে, চার বছরের ভুলোর জন্য, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সামিল হয়ে, হাড় লিকলিকে শক্ত শরীরে, মনের জোড়ে দাঁড় টেনে টেনে, এই ভাটার সময়, চওড়া নদীতে বয়ে চলাই তাদের জীবিকা আর বৈবাহিক জীবনযাপন। যখন নদীর জল আর আকাশ দুজনে এক সঙ্গে কালো বিভীষিকায় নিজেদের মুড়ে ফেলেছে, যেখানে হাওয়া নিমেষে অন্তরালে লুকিয়ে, গুমোট বৃষ্টির পূর্বাভাস — সেখান সময় দূর্যোগের, এক অপেক্ষমান পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠেছে। মাছ, কাঁকড়া ধরতে বেড়ানোর সময় ঘর থেকে মাছ ধরার জাল আর কিছু হাতে তৈরী বাঁচবার মারণাস্ত্র নিয়ে বেড়োনোর সঙ্গে সঙ্গেই বিপত্তির শুরু।

করোনার আগ্রাসী ছোবল, তার উপড় জুন মাস, বর্ষা সবে ঢুকেছে, কিন্তু এবছর তার প্রাধান্য তারই দোসর ঝড়কে সাথী করেছে, যার জোরালো উপস্থিতিতে আদিবাসীদের নাজেহাল অবস্থা। মাটির ঘর মাটি ছুঁতে চায়, চালা আমফানে ছিন্নভিন্ন, এমতাবস্থায় পঞ্চায়েতের দেওয়া একফালি প্লাস্টিক মাথায় তুলে নেওয়া, দড়ি আর বাঁশের জোড়াতালির সঙ্গে নিজেদের ঢেকির বুদ্ধি আর অনেকটাই মেহনত যা ঘাম ঝরানোর ফসল এই টিকে থাকা, মাথা গুজরানোর চার বাই পাঁচের তৈরি করা আস্তানা।

পরিস্থিতি ঘোরালো নিয়েই বেড়োতে হল। মাছ ,কাঁকড়া ধরা যাদের পেশা তাদের কাছে এই মেঘলা পরিবেশে কিছু যায় আসে না।ডিঙিটাই নিজেদের সম্বল, তাও বেশ পুরানো, ঢালির বাবার হাতের তৈরি করা ,যেটা শেষ করে তার বাবার আর ওই ডিঙিতে চড়া হয়ে ওঠেনি, বাঘের খাদ্য হয়ে গেছিল নিজেই। এসব এখানের জলভাত ,কেউ ভাবেনা। বেঁচে থাকাটাই অবিশ্বাস্য। মরে গেলে শেষ, যে বেঁচে রইলো তার পিছুপানে তাকানোর সময় থাকে না, স্মৃতি বলে কোন শব্দজ্ঞান এদের নেই। জীবন এখানে একটানা চাকায় ঘোরে, চাকা বসে গেলে দ্বিতীয় বিকল্প কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

একটা ঠান্ডা হাওয়া অন্য কোথাও বারিপাতের গল্প বলছিল। হঠাৎই ঢালি শিহরিত হয়ে উঠল, দূরে কালো জলে আরও কালোর নড়নচড়নে। মুন্নি ও ঢালির চোখ ভয়ার্ত মেঘ দেখেই সজাগ হল। ধারালো দাঁটা তুলে নিল হাতে , চোখ দুটি ক্ষিপ্ত আগুনে জ্বলজ্বল করে উঠল, হ্যাঁ অনুমান সঠিক – দুর থেকে তাদের ডিঙি নজর করে এগিয়ে আসছে কালো খর্বকায় ডাঙা আর জলের বিভীষিকাটি।

— কালা দুশমন , কুম্ভীর —-!

কথা শেষ হল না ঢালির, নিমেষের মধ্যে বিশালাকার ওই জন্তুর আক্রমণে ডিঙি নড়েচড়ে উঠল, মুন্নি দাঁ দিয়ে এক কোপ বসাল, যতোটা হাত যায় , একবার, দুবার বেশ ভালো আঘাত পেল কুমিরটা ,মস্তক খানিকটা কেটে গেল। আরো ক্ষিপ্র গতিতে সে ডিঙি র নিচে দিয়ে গিয়ে, উল্টোদিকে চলে গিয়ে, চকিতে মুখ দিয়ে টান মারল,যেখানে হাল ধরেছিল ঢালি। ডিঙি উল্টে গেলো। ঢালি ও হাতের হাল দিয়ে মারল সজোরে, ভালো আঘাত পেল জন্তুটি। চারদিক অন্ধকার, জলে কালো কালো মেঘের কালচে ছবিতে কালো জন্তুটার অস্তিত্ব ঠাহর হতে সময় লাগছিল ওদের, জন্তুটিও সমান সুযোগের অপেক্ষায় দাঁত কামড়াচ্ছিল। ডিঙি উল্টে বিপদ বাড়ল, ঘরোয়া অস্ত্র আর প্রয়োজনীয় জিনিস নাগালের বাইরে, তদুপরি জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে লড়াই, এতো বড় কথাটার মুখোমুখির সামনে পড়ে গেল দুইজনায়। প্রথমেই ডুব সাঁতার দিয়ে দুজনে একটু দূরে সরে যেতে চেষ্টা করল, কিন্তু বিশালাকার প্রানীটির সঙ্গে পারা মুশকিল হচ্ছে যে! পিছনে চলে গেছিল মুন্নি, দাঁয়ের কোপ চালাতে লাগল অনবরত , সামনে থেকে সরে যাওয়ার আপ্রান লড়াই জারি রাখল শক্ত সামর্থ শরীরের উত্তরাধিকারী ঢালি। লড়াই বেশ চলল, মুন্নির সঙ্গে কুমীরের, আর নিরস্ত্র ঢালি নিজেকেই বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জল প্রচন্ড আওয়জে ফুলে ফেঁপে উঠছে, উপড়েও মেঘের গর্জন শুরু হয়ে গেছে, বৃষ্টিপাতও শুরু হয়ে গেল, প্রকৃতির এক বিভ্যৎস রুপ প্রকাশিত তখন। সাহসী মুন্নির আঘাতে জন্তু অনেকটাই কাহিল হয়েছে, এই ভেবে অশান্ত, ক্লান্ত মুন্নি কিছুটা মূহুর্ত নিরীক্ষণ করতেই, প্রবল বেগে বৃষ্টিপাত শুরু হলো সঙ্গে প্রবল হাওয়া, আর এই অবকাশেই হঠাৎই প্রচন্ড শব্দে কুমিরটা লাফিয়ে উঠে ঢালিকে ধরার জন্য জলে আছড়ে পড়ল। সচকিতে মুন্নি ও দাঁটা ছুঁড়ে দিলো সজোরে, কালো জলে বুঁদবুঁদ করে লাল রক্ত ফেনিয়ে ফেনিয়ে উঠতে থাকল, নিঝুম রাতে, ভোর হওয়ার অনেক আগেই কাকেরা যেন কোনো অশুভ ইঙ্গিতে ডেকে উঠল। ভেসে যাওয়া রক্তজলে মুন্নির পড়নের সাদা শাড়ি লাল রঙে ভিজে রক্তাম্বর হয়ে উঠলো।

এতক্ষণ ধরে বলা আমার এই সব কাহিনী থেকে পরিস্ফুটিত যে জঙ্গলে অসহায় আদিবাসীদের এই লড়াই শুরু হয় সুর্যদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত, সারাদিন সারারাত। আর এখানেই এদের রক্ষার জন্য যিনি পরিত্রাণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন, তিনিই হলেন এই দক্ষিণ রায় বাবা ধপধপির দক্ষিনেশ্বর।

লোকদেবতা হলেন দক্ষিণরায়। কেন তাকে লোকদেবতা বলে জানেন? আসলে তিনি সাধারণ গরিব প্রান্তিক মানুষের রক্ষার নিমিত্তে এমনই এক মানুষ অবতার যিনি কোন স্বর্গীয় বা কোন কাল্পনিক দেবতা নন। জ্বলজ্যান্ত এক মানুষ যিনি সরাসরি মানুষের কষ্ট বুঝে তাদের উপকার এবং রক্ষা করেন।

এই দেবতা ভারতবর্ষ এবং বাংলা দেশের সুন্দরবন অঞ্চলে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পূজিত এক লোকদেবতা। তিনি জঙ্গলের জন্তুজানোয়ারদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং নিজের অধীনে রাখতে পারেন। বাঘ তার কথা শোনে তাই তিনিই বাঘের রাজা। অন্যদিকে অরণ্যে অনেক শয়তান বা দানব থাকে, সেগুলোর উপর তার করায়ত্ত বিশেষ ভাবে আরোপিত থাকে। সুন্দবনের ভাটিখানাগুলো সবই তার কথা শোনে তাই দক্ষিণরায়কে সুন্দরবনের ভাটি অঞ্চলের অধিপতি বলে মেনে নেয়। লোকদেবী বনবিবি ও পীর বড়খাঁ গাজীর সাথে দক্ষিণ রায়ের বিরোধের কথা সুন্দরবনের লোককাহিনী, সংস্কৃতি, পালাগানের আরও এক অঙ্গ।

সুন্দরবনের অধিবাসীরা যখন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে মাছ ধরতে, কাষ্ঠ বা মধু আহরণ করতে যেত তখন তারা প্রথমে দক্ষিণরায়ের মন্দিরে পূজা দিত এবং নিজের মাথার পিছন দিকে দক্ষিণরায়ের মুখোশ পরে জঙ্গলে ঢুকতো, যাতে বাঘ সেই মুখোশ দেখে ভয় পেয়ে তাঁর কাছে আর না আসে।

এরকভাবেই জনপ্রিয় হয় এই লোকদেবতা। তাই আজও সুন্দরবনের দ্বারপ্রান্তে বারুইপুর অন্তর্গত ধপধপি অঞ্চলের এই বাবা দক্ষিণেশ্বর এই অঞ্চলের সকল প্রান্তিক মানুষের আরাধ্য দেবতা হয়ে রয়েছেন। আর এই মন্দির তাদের ভালবাসার এক আদৰ্শ স্থান। আজও এখানে নিত্যসেবা হয়। মঙ্গলবার আর শনিবার এখানে বাবা দক্ষিণরায়ের বিশেষ পূজার্চনা হয় এবং জনসমাগমও হয় প্রচুর। জনশ্রুতি আছে এখন সকলের মনোস্কামনা পূর্ণ হয় এবং সকল রোগ ব্যাধির নিরাময় হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *