কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্যের কবিতা ( কবি যতীন্দ্রপ্রসাদের ৭৫ টি সংস্কৃত ছন্দের নিজস্ব বাংলা কবিতার পনেরোটি)
রাধাকৃষ্ণ গোস্বামী (রাধু)
কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য ছিলেন এক আন্তরিক কবি। ভালবাসার কবি। ভাল লাগার কবি। একদিন তিনি রামায়ণ পড়তে গিয়ে বিস্ময়ে, হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ নায়েবী তাকিয়ায় বসেই থাকলেন, কেননা তাঁর দৃষ্টি আটকে ছিল প্রথম শ্লোকটিতে :-
” মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীসমা।
যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকম বধীঃ কামমোহিতম্।।..”
মহর্ষি বাল্মীকি তমসা নদীতে স্নান করতে যাবার সময় নদীর ধারের বনের এক গাছের ডালে সম্ভোগে রত ক্রৌঞ্চ যুগলের ক্রৌঞ্চের ব্যাধে হাতে নিধন দেখে ফেলেন এবং শোকে বিহ্বল তিনি উচ্চারণ করেন এই বাক্যটি। ……যথা নির্দেশে রচনা শুরু হয় ” রামায়ণ “॥
‘ছন্দ-সুনিপুণ কবিপ্রতিভা’ প্রবন্ধে ডঃ জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছেন, –
” প্রবর্তক পত্রিকার ১৩৫৮-৫৯ সালের পাঁচটি সংখ্যায় তিনি (কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ‘ সংস্কৃত ছন্দের বাংলা রূপ ‘ নামে যে ধারাবাহিক প্রবন্ধ রচনা করেন তাতে পঁচাত্তর প্রকার ছন্দের কথা তিনি বলেছেন। প্রবন্ধ শেষে কবিজন-সুলভ ঈষৎ গর্বের ভঙ্গিতে তিনি বলেছেন, –

একটানা এই দীর্ঘ জীবন সংস্কৃতের কুঞ্জবনে
ছন্দ-পাখী ধরার তরে কেউ মাতেনি গুঞ্জরণে।
ঠিক পঁচাত্তর রকম পাখী কেউ ধরেনি আমার আগে,
প্রাণটা রেখে করতে শিকার রাত দুপুরে কে আর জাগে!
‘প্রাণটা রেখে করতে শিকার’ অর্থাৎ সংস্কৃত ছন্দের প্রাণস্পন্দন অক্ষুণ্ণ রেখে , পদ্য নয়, সত্যকার কাব্য লেখায় যে শক্তিমত্তার পরিচয় যতীন্দ্রপ্রসাদের কবিতায় আমরা পেয়েছি তার তুলনা অল্প ই আছে।”…
কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ এরপর যথারীতি রামায়ণ মহাকাব্য পাঠ করতে শুরু করলেন আর মাঝে মাঝেই ভাবতে লাগলেন, বাল্মীকির ছন্দ ! কী অপূর্ব ! বাল্মীকির অনুষ্টুপ ছন্দ :-
” মা নিষাদ। প্রতিষ্ঠাংত্ব।
মগমঃ শা । -শ্বতী সমা !”
বাল্মীকির অনুষ্টুপ ছন্দ
কবি লক্ষ্য করলেন – এর প্রথম পাদে যথাক্রমে গুরু লঘু গুরু গুরু লঘু বর্ণ বসাতে হবে। দ্বিতীয় পাদে যথাক্রমে দুটি লঘু দুটি গুরু একটি লঘু আর একটি গুরু বর্ণ বসালেই ছন্দের ধ্বনি ধরা পড়বে। যেমন –
( # – গুরু বর্ণ
। – লঘু বর্ণ )
# । # # । # # ।
একলা দিন্ রাত্ কেবল কার্য !
॥ # # । # । #
“কোথা যশ কই? সদাই শাসন !
ছিন্ন বস্ত্রের বিকট গন্ধ !
তারি জিম্বায় বাসন্ – কোসন !
রান্না নিত্যই ! সময় কই গো,
ছেলে দেখ্ বার , ব্যথায় কাঁদার !
অস্থিসার রূপ ! কোথায় স্বস্তি !
ভুলে একচুল বেদম প্রহার !…….”
যাঁরা হিন্দু মতে বিবাহ করেছেন বা উপস্থিত থেকেছেন তাঁরা অবশ্যই শুনে থাকবেন “অনুষ্টুপ ছন্দের” নাম। বিবাহের ও অন্যান্য অনেক পূজা মন্ত্রে এই ছন্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এবার কবি যতীন্দ্রপ্রসাদের কবিকৃত ছন্দের ব্যবহারের কথা কবির ভাষায় বলে নিই – ” আজ আমি কাব্যরসিকবৃন্দের সমীপে কতকগুলো সংস্কৃত ছন্দের বাংলা রূপ কেমন, তা দেখাতে চাই। সংস্কৃত ছন্দের মধ্যে বৃত্ত ছন্দই প্রধান। এই শ্রেণীর ছন্দের প্রত্যেক চরণে অক্ষর সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকে এবং প্রত্যেক অক্ষরের লঘুত্ব ও গুরুত্ব নির্দিষ্ট থাকে। প্রত্যেক চরণে ৩০টি পর্যন্তও অক্ষর থাকতে পারে। অক্ষরের সংখ্যা এবং লঘু-গুরু বিন্যাসের রকমফেরে বহু প্রকার ছন্দ তৈরী হয় এবং তাদের পৃথক পৃথক নামকরণও হয়ে থাকে। আমি অসংখ্য সংস্কৃত ছন্দ থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৭৫টি ছন্দ বাংলায় রূপান্তরিত করেছি ; তাদের আক্ষরিক রূপ কেমন দেখায় , তাই দেখাবো।….
উদ্ধৃত উদাহরণগুলো সবই মদ্রচিত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কবিতা গুলোর এক একটি গুচ্ছ বা স্তবক (stanza) ।”
কবি লিখলেন :-
২
অনুকূলা ছন্দ
এর প্রতি পাদে একটি গুরু, দুটি লঘু, দুটি গুরু, চারটি লঘু ও দুটি গুরু অক্ষর থাকলে এটি অনুকূলা ছন্দ হবে। যেমন –
# । । # # ॥ ॥ # #
“গান্ধী, তোমায় এক বধিয়াছে নিষ্ঠুর !
নাইরে এমন নীচ মহাপাপী দুর্জন !
আজ্ কে ভারত্ ময় শিশু যুবা সব্বাই
হিন্দু মুসলমান কাঁদিতেছে লোকজন !!….”
প্রথম ছত্রটির গুরু লঘু বর্ণের কিভাবে করা হয়েছে, তা ধরতে পারলেই, অন্য তিনটি ছত্রের বর্ণবিন্যাস বুঝ্ তে বিন্দুমাত্র কষ্ট হবে না। প্রথম ছত্রের অনুরূপ অন্য তিনটি ছত্র। যুক্তাক্ষরের পূর্ব বর্ণ গুরু এবং ব্যঞ্জনান্ত বা হসন্ত বর্ণের পূর্ব বর্ণ গুরু হবে ; আর সব বর্ণ বা অক্ষরকেই লঘু মানতে হবে। আরো একটু পরিষ্কার করে’ বলছি : ঐ প্রথম ছত্রটিতে ছন্দের রূপ ফুটিয়ে তুলে লিখতে হ’লে লিখতে হবে -প্রতিটি বর্ণের পূর্ণ উচ্চারণ অনুসারে এইরূপ :-
# । । # # ॥ ॥ # #
গান্ ধী, তোমায়্ এক্ বধিয়াছে নিষ্ ঠুর !
অন্যান্য তিনটি ছত্রের ছন্দরূপ অবিকল প্রথম ছত্রটির অনুরূপ। সর্বত্র এ ভাবে যুক্তাক্ষরকে ভেঙে লঘুগুরু বর্ণ বিন্যাস করা হয়েছে। (বাংলায় হ্রস্ব ও দীর্ঘ বর্ণের উচ্চারণ নেই। তাই যুক্তাক্ষরের পূর্ব বর্ণ এবং হসন্ত বা ব্যঞ্জন বর্ণের পূর্ব বর্ণকে দীর্ঘ উচ্চারণ করা হয় বলেই গুরুবর্ণ মানা হয়েছে। )
৩
ইন্দিরা ছন্দ
এ ছন্দটির প্রতি পাদে ক্রমান্বয়ে তিনটি লঘু বর্ণের পর একটি গুরু একটি লঘু একটি গুরু আবার একটি গুরু একটি লঘু একটি গুরু একটি লঘু বর্ণ বসাতে হবে এবং সর্বশেষে আর একটি গুরু বর্ণ বসিয়েই শেষ করতে হবে। যেমন –
। । । # । # # । # । #
গৃহিণী সংসারীর শান্তিদাত্রী ঠিক,
যদি সে মুর্খা হয় রক্ষা নাইরে আর !
অযথা অর্থ নাশ কর্ বে নিশ্চিতই,
আলয়ে নাচবে ভূত পেত্নী সত্য তার !!
কথাটা বল্ তে হয় : কীর্তি রাখ্ তে চাও ?
বিবাহ বিঘ্নকর তীব্র দুঃখময় !
ও – পথে ধায় অবোধ অজ্ঞ অর্বাচীন,
সাধনা কর্ তে চাও ? এক্ লা থাক্ তে হয়।।
এই ইন্দিরা ছন্দে শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের একত্রিশ অধ্যায়ে ‘গোপিকা – গীত ‘ এ বাদরায়ণ ব্যাসদেব ব্যবহার করেছেন :-
জয়তি তেহ ধিকং জন্মনা ব্রজঃ
শ্রয়ত ইন্দিরা শশ্বদত্র হি।
দয়িত দৃশ্যতাং দিক্ষু তাবকা-
স্ত্বয়ি ধৃতাসবস্ত্বাং বিচিন্বতে।।…..”
এর অর্থ হলো, (রাসলীলার মাঝখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় সখীরা তাঁকে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে শেষে গান ধরলেন) ” গোপীরা গান গাইতে নিয়ে বললেনঃ প্রিয়, আপনার আবির্ভাবে এই ব্রজভূমি বৈকুন্ঠের থেকেও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে। স্বয়ং ইন্দিরা বা লক্ষ্মী একে অলঙ্কৃত করে নিরন্তর বাস করছেন। এতে ব্রজের সকলেই সুখী। কিন্তু নাথ, যাঁরা আপনারই জন্য প্রাণধারণ করছেন, সেই অভাগিনী গোপীরা আপনার বিরহে নিতান্ত কাতর হয়ে এখানে দিকে দিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।”
(লেখক কৃত অনূদিত, শ্রীমদ্ভাগবত, প্রকাশক আবদুল আজীজ আল-আমান এম এ, হরফ প্রকাশনী , কলকাতা , রথযাত্রা, ২ শ্রাবণ ১৩৮৪/ জুলাই ১৯৭৭) ।
৪
গজমতি ছন্দ
এর প্রত্যেকটী ছত্রে তিনটি লঘু, একটি গুরু, তিনটি লঘু ও একটি গুরু বর্ণ আছে। যেমন –
। । । # । । । #
নেমেছে দেশ জুড়ে’ বাদল,
বাজিছে নীল্ নভে মাদল ;
ভরেছে নদ নদী পুকুর।
তথাপি জল যাচে চাতক,
না জানি , হায় কত পাতক !
তৃষাতে প্রাণ সদা আতুর !!
৫
চণ্ডী ছন্দ
প্রতি চরণে যথাক্রমে ৮টি লঘু, একটি গুরু, দুটি লঘু ও দুটি গুরু বর্ণ থাকবে। যেমন –
। । । । । । । । # । । # #
আশা রেখো, আশা রেখো বুক ভরে’ সব্বাই
সে আশারে ভাষা দিয়ো, বন্ধুরা, নিত্য ই !
আশা যেন বাসা বাঁধে বক্ষেতে নির্ঘাৎ,
পরিচিত হবে তবে বীর বলে’ সত্য ই ।।
৬
চণ্ডবৃষ্টি প্রপাত ছন্দ
এর প্রতি চরণে যথাক্রমে ৬ টি লঘু, একটি গুরু, একটি লঘু,
একটি গুরু, একটি গুরু, একটি লঘু ,
একটি গুরু, একটি গুরু, একটি লঘু,
একটি গুরু, একটি গুরু, একটি লঘু,
একটি গুরু, একটি গুরু, একটি লঘু,
একটি গুরু, একটি গুরু, একটি লঘু,
একটি গুরু, একটি গুরু, একটি লঘু,
একটি গুরু বর্ণ থাকবে, তবে এ ছন্দের সুর ছন্দে বেজে উঠবে। একটি ছত্রেই এতগুলা লঘু গুরু বর্ণের সমাবেশ হবে বলে’এই প্রথম ছত্রটি অত্যন্ত লম্বা হবে; তাই প্রথম ছত্রটিকে ভেঙে দুছত্রে লেখা গেল। যেমন –
। । । । । । # । # # । # # । #
হৃদয়ে হৃদয়ে আজ্ আগুন্ জ্বলছে খুব্ বিশ্বময়্,
# । # # । # # । # # । #
পুড়্ তে হয়্ পুড়্ বো তায়, মর্ তে হয়্ মর্ বো ঠিক্।
সবি মেনে নিতে চায় না প্রাণ, বিপ্লবীর আর না সয়,
লুপ্ত আজ ধর্মবোধ, হচ্ছে ভুল দিক্ বিদিক্।
অভাবে অভাবে অস্থি সার, অন্ন নাই বস্ত্র নাই,
হাড় ক’খান্ পঞ্জরের আজ ক্ষ্যাপায় মন আবার ;
ঘরে ও বাহিরে অত্যাচার, চল্ ছে ঘোর বঞ্চনাই,
কৃষ্ণ মেঘ ছায় আকাশ, বজ্রপাত হোক্ এবার ।।
৭
জলোদ্ধতগতি ছন্দ
এর প্রতি চরণে যথাক্রমে লঘু গুরু লঘু লঘু লঘু গুরু লঘু, গুরু লঘু, লঘু লঘু গুরু বর্ণ বসাতে হবে। যেমন –
। # । । । # । # । । । #
বাজাও ডমরু, দেব, বিষাণ ফুকারো, শিব !
তা-থই তাথিয়া তাল কাঁপাক দুনিয়া ফের্ !
আবার জাগিয়া দীন লভুক্ হারানো প্রাণ,
নিশঙ্ক করি’ মন ছুটুক করিতে কাজ । ।
৮
ত্বরিতগাতছন্দ
এর প্রতি পাদে যথাক্রমে চারিটি লঘু, একটি গুরু, চারটি লঘু ও একটি গুরু বর্ণ থাকা চাই। যেমন –
। । । । # । । । । #
বসে’ বসে’ খায় যারা বড় নয়্,
বড় যারা প্রাণ পণে খেটে খায়।
টাকা কড়ি আগ্ লালে বড় হয়,
হেন বোকা নাই এবে দুনিয়ায়।।
৯
তনুমধ্যা ছন্দ
এর প্রতি চরণে যথাক্রমে দুটি গুরু, দুটি লঘু ও দুটি গুরু বর্ণ থাকবে। যেমন –
# # । । # #
রোস্ দিল্ খোলা, বাপ মোর !
অন্তর খাঁটি রাখ্ তোর !
গুল্ জার্ করি ‘ সংসার
নিস্ পথ খুঁজে বাঁচ্ বার ॥
১০
তোটক ছন্দ
এর প্রতি পাদে যথাক্রমে লঘু লঘু গুরু, লঘু লঘু গুরু, লঘু লঘু গুরু এবং লঘু লঘু গুরু বর্ণ বসানো আবশ্যক।
। । # । । # । । # । । #
নারী , র ইছো হিয়ায়, সবি লাগ্ ছে ভালো !
সারা বিশ্ব মাঝার একি জ্বাল্ লে আলো !
মনো – কুঞ্জে আমার মধু – গুঞ্জরণে
কত তন্ত্রী সদাই মৃদু মুঞ্জরণে ।।
১১
দ্রুতপদ ছন্দ
এর প্রতি পদে যথাক্রমে তিনটি লঘু, একটি গুরু, ছয়টি লঘু ও দুটি গুরু বর্ণ থাক্ বে।
। । । # । । । । । । # #
(ক) জগতে আর চাহি না কিছু, তোমায় চাই !
থাকিতে চাই তোমারি সাথে জীবন-ভোর্ !
শকতিময়, তোমারে পেলে সকল পাই !
করেছি তাই শকতি ‘ পরে সুনির্ভর ! !
(খ) ওরা যে দেশ জাতিরে সদা জোগায় সব,
বিকায়ে দেয়, চাউলে ধানে বাঁচায় দেশ ;
ঘোচে না দুখ্ , এমনি ওরা জরদ্গব !
না খেয়ে রয়, মরিয়া করে জীবন শেষ ! !
দুর্মিল ছন্দ
যার প্রতি চরণে দুটি লঘু ও একটি গুরু বর্ণে গঠিত হয়েছে, তাকেই দুর্মিল ছন্দ বলা যাবে। যেমন –
। । #
শোভমান্
মণিলাল,
তারে নাশ
করে কাল !!
১৩
মন্দাকিনী ছন্দ
এর প্রতি চরণে ছয়বার লঘু, একবার গুরু, একবার লঘু দুবার গুরু, একবার লঘু ও একবার গুরু বর্ণ ক্রমান্বয়ে বসাতে হবে।
। । । । । । # । # # । #
স্বামী জ্ঞানী ধনবান্, অভাব বিন্দু নাই,
কৃতী ছেলে আছে এক পরম্ ভাগ্যবান্;
তবু সদা মনে আশ – কোথায় শান্তি পাই,
সতত করিলা সার শ্রীপদ্ বন্দনাই !!
সঁপে দিলা প্রীতি প্রেম শরীর চিত্ত সব
শ্রীচরণে রাধেশের সকল স্বার্থবোধ ;
অবশেষে বুঝি সেই দেবের পায় বিভব,
আঁখি শুধু দেখে রূপ, ফুরায় কন্ঠরব !!
১৪
মন্দাক্রান্তা ছন্দ
একটি অনেক প্রচারিত দুর্দান্ত ছন্দ। এর প্রত্যেক চরণে যথাক্রমে চারটি গুরু পাঁচটি লঘু দুটি গুরু একটি লঘু দুটি গুরু বর্ণ একটি লঘু ও শেষে দুটি গুরু বর্ণ খুব হিসাব করে বসাতে হবে। তারপর প্রথম চারটি গুরু বর্ণের পর একবার যতি পড়বে ; আবার পাঁচটি লঘু ও একটি গুরু বর্ণের পর আর একবার যতি পড়বে এবং শেষে একটি গুরু একটি লঘু দুটি গুরু একটি লঘু ও দুটি গুরু বর্ণের পর আবার যতি পড়বে।
প্রত্যেক ছত্রে তিনবার যতি বা বিরাম দিয়ে সুর টেনে টেনে পড়তে হবে। যুক্তাক্ষরের পূর্ব বর্ণ এবং হসন্ত বা ব্যঞ্জনান্ত বর্ণের পূর্ব বর্ণ যে গুরু বর্ণ, একথা সর্বপ্রথমেই বলছি।প্রথম ছত্রটির স্বর ও ব্যঞ্জনান্ত বর্ণের বিন্যাস কি ভাবে করা হয়েছে এবং তাতে গুরু ও লঘু কিভাবে মেনে নেওয়া হয়েছে, তা বুঝতে পারলেই এই ছন্দটির ধ্বনির গুরুগম্ভীর আওয়াজ অক্ষর সঙ্ঘাতের গুণে বেজে উঠবে। আমি ক্রমান্বয়ে মদ্রচিত তিনটি দীর্ঘ কবিতার তিনটি স্তবক বা গুচ্ছ উদ্ধৃত করে’ বোঝাতে চেষ্টা কর্ বো। যেমন –
(ক)
# # # # । । । । । #
বাংলার সত্যেন অকালে গেল আজ
# । # # । # #
রইলো স্থান তার অপূর্ণ
অশ্রুর তর্পণ চলেছে বাঙালীর
বক্ষ পঞ্জর বিচূর্ণ !
নিষ্ঠুর সংবাদ ছেয়েছে সারা দেশ,
হায় কি আফশোষ অশান্তি।
বুঝতাম কয় জন, কি ছিল সে মোদের
হায়রে হায় হায় কি ভ্রান্তি !
( কবি ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অকাল প্রয়াণে (জন্ম ১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ – মৃত্যু ২৫ জুন ১৯২২) কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য (১৮৯০-১৯৭৫) অনুজের মাত্র চল্লিশেই মৃত্যুতে ভীষণ ভাবে শোকাহত হন। তাঁর শোকে তিনি অশ্রুসিক্ত এই হৃদয় বিদারী এই কবিতা রচনা করেন)
কবি লিখেছেন,
এখানে প্রথম ছত্রের বিরাম বা যতি পড়বে, আমি সেখানে সেখানে মধ্যে ( , ) চিহ্ন দিয়েছি । ছত্রের শেষে তো যতি পড়বেই। তারপর ‘ অপূর্ণ ‘ শব্দটির অ লঘু, পূর গুরু এবং শেষবর্ণ ণ বিকল্পে গুরুই ধরতে হবে। শেষ বর্ণ বিকল্পে গুরু বা লঘু হয়ে থাকে। আমি শেষ বর্ণ গুরুই ধরেছি।
এর পরেই ( খ ) স্তবকে এমন ভাবে অক্ষর যোজনা করেছি যে, তাতে শেষ বর্ণটি হসন্ত বা ব্যঞ্জন বর্ণ হ ওয়াতে তার পূর্ব বর্ণটি আপনা হতেই গুরু উচ্চারিত হতে বাধ্য। যেমন –
(খ)
# # # # । । । । । # # । # #
অন্তর অস্থির, নয়নে নাহি ঘুম, হায় কি বিচ্ছেদ –
। # #
জীবন যায়্ !
তার সেই মুখখান্, তারি সে এলো-চুল দেখতে একবার
হৃদয় চায়।
কই সেই কৈশোর , পুলকে-ভরা বুক, স্বপ্নে ভর পুর
দোঁহার প্রাণ !
যৌবন যায়-যায় , তবুও বঁধুয়ার, নয়তো ভুলবার
প্রেমের দান !!
(গ )
আস্ বাব – পত্তর , টাঙানো ছবি ঢের, আয়না সোপ্-কেস্
মলিন সব !
সব্বাই কষ্টের, টানিছে যেন জের্ , একটা হেরফের্
সমুদ্ভব !
সব হয় জের্ বার্, কে বোঝে ব্যথা কার, পায় না মার্জার
প্রসাদ আজ !
সন্ধ্যার পর আর্ জ্বলে না কোনো দীপ, অন্ধকার্ ময়
প্রাসাদ মাঝ !!
১৫
পঞ্চচামর ছন্দ
এর প্রতি পাদে ক্রমে একটি লঘু ও একটি গুরু, একটি লঘু ও একটি গুরু অক্ষর সন্নিবিষ্ট হবে। যেমন –
। # । #
মাথায় কি ভার !
সহাস বদন ;
সুখের জীবন,
মধুর সদন ॥
কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ ভট্টাচার্য’র লেখা পঁচাত্তরটি সংস্কৃত ছন্দের বাংলা নিজের কবিতা রচনার উপর আলোচনা করা। তার জন্য অনেক সামর্থ্য ও সময়ের প্রয়োজন, একথা পাঠকমাত্রেই স্বীকার করবেন । তাঁর কবিতাই কবির উন্নত জনদরদী মানসিকতার পরিচয় দেয়। কবি যতীন্দ্রপ্রসাদ বাংলা ভাষা প্রিয় সব মানুষের কাছে বেঁচে থাকবেন বলে বিশ্বাস।
যতীন্দ্রপ্রসাদ অমর রহে। জয় হো।

