কবিতাঃ সোমনাথ সাহার তিনটি কবিতা

সোমনাথ সাহার তিনটি কবিতা

স্বত্বাধিকার

“Be a philosopher; but amidst all your philosophy, be still a man.”
ডেভিড হিউম

হিম পড়ে ভিজে যাওয়া স্বপ্নের ভিতর দেখলাম অসম্পূর্ন কবিতার মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে,
দেখলাম মৃত কবিদের প্রোফাইলও প্রতিবাদ করছে,
আরো দেখলাম কবরেরা মৃত্যুর পরেও কথা বলছে।
এখন দেখছি,
শব্দকে ছুঁয়ে বসে আছি অন্য এক আমি।
যারা প্রতিবাদ করে মিছিল করছে,
তারাই একদিন আমার কাছে পাখি হতে চেয়েছিল।
আমি তাদের জন্য বানিয়ে ছিলাম আকাশ;
বানিয়ে ছিলাম অরণ্য-ঝর্ণা-নদী-পাহাড়।
তারা জানতে চেয়েছিল জলের কি কোনো সাম্প্রদায়িকতা আছে?
আমি মৌন হয়ে ঈশ্বরের কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম।
তারা কিশোর-কিশোরীর মুক্ত আলিঙ্গন দেখে প্রশ্ন করেছিল, এরা কোন সামাজিক পাপে যুক্ত ?
আমি তাদের হয়ে বলেছিলাম ওরা প্রেমিকার ঠোঁট ভেবে প্রথম চুম্বন আঁকছে।
তার পর,
হঠাৎ ওরা জানতে চাইলো আমি বৃষ্টি হতে পারবো কিনা?
আমি বল্লাম বরং তোমরা বৃষ্টি হও, আমি হব সাগর।
সবশেষে ওরা জানতে চাইলো তোমার পতাকার রং কি?
আমি নিঃশব্দে চোখ খুলে রাখা কান্নার মতন উত্তর দিলাম- ওই ধর্ষিতা বোনের শাড়ি আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।
তার পর সবাই চুপ;
এখন চোখ বুঝলে শুধু মিছিল দেখি,
বুলেটবৃদ্ধ মানুষ দেখি,
রক্তমাখা স্বপ্ন দেখি।

শ্রীচরণেষু মা

“Except for Mankind, all Creatures are Immortal, as they are Ignorant of Death”!
হোর্হে লুই বোর্হেস

জীবিতকে তুষ্ট করার মতো সময় আমার নেই,
মৃত কে ভালোবাসার সময় আমার অনন্তকাল।
তাই হয়ত মায়ের গন্ধ,মায়ের উত্তাপ সবই নিকষ অন্ধকারে কেবল একটা শব্দ হয়ে জাপটে ধরেছে আমায়।
মা বলত আমায়–
আমি আসব তোর কাছে। ঠিক আসব, দেখিস।
আর যদি না আসি, বুঝবি আত্মা আসতে পারে না।
তারা স্মৃতির খামে লেগে থাকে জলছবি হয়ে।
আমি বিশ্বাস করতাম মা’র কথা।
মা তো কখনও মিথ্যা কথা বলত না।
মায়ের মুখে রাগ মেশান খুশি দেখেই বুঝতাম মায়ের শরীর মন কখনো কখনো ঘরের অঙ্গন ছাড়িয়ে চলে যেত জগতের আনন্দ যজ্ঞে।
সবাই খুব অবাক হয়েছিল দেখে, যে যতটা ভেঙে পড়ার কথা আমার তার তুলনায় আমি যেন অনেক বেশি শক্ত।
আসলে, মা’র ওই সান্ত্বনাটাই ছিল আমার শক্তি।
মাতৃগর্ভ থেকে যখন উলঙ্গ ভূমিষ্ট হয়েছিলাম নিজেকে অগ্নিশুদ্ধ করে ফিরিয়ে এনেছিলাম তোমার চরণে।
জানতাম, মা যখন বলেছে ঠিক আসবে।
আমাদের আবার দেখা হবে, কথা হবেই।
অন্ধকারে অস্পষ্ট অনুভব করতাম মায়ের গোপন হাসি মুখ।
মা তো আমাকে ‘আসি’ বলেও গেল না। তা কেমন করে হয়?
আমাদের অভিমানও চুপ করে শুয়ে থাকতো মাটির গোপনে।
রাতের পর রাত জেগে থেকেছি আমি।
যদি মা আসে!
মা তো ! এসে যদি দেখে আমি ঘুমিয়ে আছি, হয়তো ডাকবে না। চলে যাবে।
খুব ইচ্ছে করতো দু-হাত ভরে ভাসিয়ে দিতে চরাচরের সমস্ত পাপ, অতৃপ্ত মায়া তোমার চরণে।
জীবনের গানে কান্না জমলে মা আসতো আঁচল নিয়ে পাখিদের গান হয়ে।
আজ একা একা ভিজে যাওয়া অন্ধকারে আমি ভাবছি তোমায় কি কোনোদিনও দিয়েছি আমি আমার সকল শূন্য করে ?

যা কিছু বলা বাকি

“যে কোনও সময়, পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই থাকি না কেন— সর্বদা কেবল ভারতের প্রতিই আমার অধীনতা, আমার আনুগত্য। চির দিনই তাই থাকবে।”
সুভাষচন্দ্র বসু,বার্লিন বেতারে, ১ মে ১৯৪২

আমার ভবিষ্যতের কপালে যা কিছু লেখা বাকি আছে ,তা প্রেমিকার প্রথম স্পর্শের মতন আমি অনুভব করতে পারি।
বুঝতে পারি এ জীবন কেটে যাবে কারাগারের দেওয়ালে ; হয়তো -বা মারা যাবো গুলির আঘাতে কিংবা ফাঁসির দড়িতে।
তবে যাই ঘটুক তুমি এইটুকু জেনে নিও সব ট্রাজেডির শেষে ভালোবাসা সরল হয়ে শুয়ে থাকে উষ্ণ ঠোঁটের তিল হয়ে।

মৃত্যুর পরেও আমি তোমার ভালোবাসার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো নীরবে, তুমি জেনে নিও।
হয়তো আর কখনো তোমায় দেখতে পাবো না,
হয়তো-বা তোমায় চিঠি দিয়ে আমার প্রেমের ভাষা বোঝাতে পারবো না, তবুও তুমি বিশ্বাস করো,
তোমার কোলেই মাথা রেখে আমি কবিতা লিখবো।
তোমার জন্যই ওই অভিমানী মেঘদের বৃষ্টি করে আনবো।

এই দেখো! বলাই হয়নি তোমায়, নিয়তি এসে বসে আছে আমাদের আলাদা করবে বলে।
তুমি চিন্তা করোনা, আমি জীবনের কাছে হাত পেতে অমৃত চাইনি।
বরং তোমার ভিতরের যে নারীটি আছে আমি তাকেই ভালোবেসেছি, তোমার আত্মাকে ভালোবেসেছি।
পরজন্মে তোমায় দেখবো বলে এজন্মের আমিকে আমি হত্যা করেছি।
তার পর—-
বসন্তের বিকেলে কোকিল হয়ে জন্ম নেবো একদিন,
গান শোনাবো তোমার মতন লাজুক কোনো নদীকে।
আর নিভৃতে রেখে যাবো আমার সমস্ত পরমায়ু নদীর বুকে।
শুভরাত্রি প্রিয়তমা,
সুভাষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *